রংপুর সংবাদ » কুড়িগ্রামে ‘বিবস্ত্র করে’ সাংবাদিক নির্যাতনের অভিযোগ

কুড়িগ্রামে ‘বিবস্ত্র করে’ সাংবাদিক নির্যাতনের অভিযোগ


রংপুর সংবাদ মার্চ ১৫, ২০২০, ১০:৩৭ পূর্বাহ্ন
কুড়িগ্রামে ‘বিবস্ত্র করে’ সাংবাদিক নির্যাতনের অভিযোগ

নিউজ ডেস্কঃঅনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম রিগ্যানকে রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে৷

পুলিশ ছাড়া আনসার নিয়ে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা দরজা ভেঙে আরিফুলের বাসায় ঢোকেন৷ এরপর তাকে মারধর শুরু করেন৷ পরে জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে নিয়ে ‘বিবস্ত্র’ করে নির্যাতন করা হয়৷ তার ভিডিও ধারণ করা হয়েছে৷ শুক্রবার রাতে কুড়িগ্রামে এমন ঘটনা ঘটেছে৷

আরিফুলের স্ত্রী মোস্তারিমা সরদার নিতু বলেন, ‘কেন আমার স্বামীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে আমরা জানি না৷ দরজা ভেঙে ৭/৮ জন বাসায় ঢোকে৷ এরপরই পেটাতে শুরু করে৷ কী অপরাধ জানতে চাইলে আরও বেশি মারতে থাকে৷ এক পর্যায়ে টিনের বেড়া ভেঙে ওকে নিয়ে যায়৷ প্রথমে তো আমরা জানতামই না, কারা নিয়ে গেছে? ধরার সময় শুধু বলেছে, তুই অনেক জ্বালাইছিস৷ পরে আমি কারাগারে দেখা করি৷ তখন সে দাঁড়াতেই পারছিল না৷ আমাকে বলল, বিবস্ত্র করে পিটিয়েছে৷ দুটি কাগজেও স্বাক্ষর নিয়েছে৷’

আরিফুলকে আটক অভিযানে নেতৃত্ব দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা৷ তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘অভিযানের সময় তার কাছ থেকে আধা বোতল মদ ও দেড়শ গ্রাম গাঁজা পাওয়া গেছে৷ এই অপরাধ তিনি স্বীকার করায় তার এক বছরের জেল ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে৷’ তবে আরিফুলের স্ত্রী মোস্তারিমা এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ‘বাসাতে তারা কোন তল্লাশি করেনি৷’

‘শুধু বলেছে, তুই অনেক জ্বালাইছিস’

কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও একুশে টেলিভিশনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আতাউর রহমান বিপ্লব বলেন, ‘গত বছরের মাঝামাঝি আরিফুল একটা রিপোর্ট করেছিলেন, জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন একটি পুকুর সংস্কার করে নিজের নামে নামকরণ করতে চেয়েছিলেন৷ ওই সংবাদের পর তার উপর ক্ষুব্ধ ছিলেন ডিসি৷ এছাড়া সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে রিপোর্ট করতে চেয়েছিলেন আরিফ৷ এ বিষয়ে জানতে পেরে জেলা প্রশাসকের অফিস থেকে তাকে বেশ কয়েকবার ডেকে নিয়ে সতর্ক করা হয়৷ এসব কারণে ডিসি তার উপর ক্ষুব্ধ ছিলেন৷ আর তার বিরুদ্ধে মাদকের যে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে তা আদৌ সত্যি নয়৷ আরিফুল মদ বা গাঁজা তো দূরে থাক সিগারেটও খান না৷ শুধুমাত্র প্রতিহিংসার কারণেই তাকে মধ্যরাতে গ্রেপ্তার ও সাজা দেওয়া হয়েছে ৷ আমরা বলেছি, ২৪ ঘন্টার মধ্যে তাকে ছেড়ে না দিলে কঠোর আন্দালন গড়ে তোলা হবে৷’

শনিবার সকালে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সাংবাদিক মহল থেকে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়৷ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়৷ জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেছেন, ‘আরিফুলের ওপর যদি অন্যায় হয়ে থাকে, তবে অবশ্যই জেলা প্রশাসককে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে৷ কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়৷ মধ্যরাতে মোবাইল কোর্ট ও সাজা কোনও কিছুই আইনসম্মত নয়৷ ডিসি বলেই সে আইনের ঊর্ধ্বে নয়৷’

এরপরই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে রংপুরের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে৷ শনিবারই কমিটির সদস্যরা আরিফুলের স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন৷

জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনে স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন, ‘আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ‘গ্যাপ’ থাকলে দেখা হবে৷ টাস্কফোর্সের অভিযান ছিল৷ এটা ম্যাজিস্ট্রেট পরিচালনা করেছে রেগুলার শিডিউলের অধীনে৷ সঙ্গে মাদকদ্রব্য অধিদফতরের লোক, পুলিশ, আনসার ছিল৷’

তবে জেলা প্রশাসকের এই বক্তব্যের সত্যতা মেলেনি৷ পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই অভিযানের সঙ্গে তাদের কোন সম্পৃক্ততা নেই৷ পুলিশ জানিয়েছেন, এই অভিযানে তাদের সম্পৃক্ততা ছিল না৷

রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার কে এম তারিকুল ইসলাম স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘ইতোমধ্যে একজন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার কুড়িগ্রামে চলে গেছেন বিষয়টি তদন্ত করতে৷ অবশ্যই টাস্কফোর্স গঠন ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার একটি টাইম ফ্রেম দেওয়া আছে৷ সেটি অমান্য করা সরকার ও প্রশাসনের জন্য বিব্রতকর৷’