রংপুর সংবাদ » দখল দূষণে মরছে পঞ্চগড়ের ৩৩ নদী

দখল দূষণে মরছে পঞ্চগড়ের ৩৩ নদী


রংপুর সংবাদ মার্চ ১২, ২০২০, ২:৩১ অপরাহ্ন
দখল দূষণে মরছে পঞ্চগড়ের ৩৩ নদী

রংপুর সংবাদ ডেস্কঃসরকারি তথ্য মতে, পঞ্চগড় জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ছোট বড় ৩৩টি নদী। অবশ্য নদী গবেষকরা বলছেন, এই জেলার উপর দিয়ে ৪৬টি নদী প্রবাহমান। তাদের মতে, এতো নদী দেশের অন্য কোনো জেলায় নেই। তাই পঞ্চগড়কে নদীর জেলাও বলছেন তারা।

বর্তমানে প্রায় অধিকাংশ নদীই অর্ধমৃত। দখল আর দূষণের কবলে পড়ে স্বাভাবিক গতি হারিয়ে ফেলেছে এসব নদী। নদীর বুক জুড়ে এখন ফসলের মাঠ।

প্রত্যেক নদীতেই অপরিকল্পিতভাবে ফেলা হচ্ছে ময়লা আবর্জনা। নদীর বুকে বিভিন্ন শষ্যের আবাদ করছেন স্থানীয় চাষীরা। আবাদে ব্যবহার করছেন সার এবং কিটনাশক। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে নদীর মাছ এবং নানা জাতের প্রাণী। এতে জেলার পরিবেশ প্রকৃতি বিপন্ন হচ্ছে।

পঞ্চগড়ের করতোয়া, ডাহুক, পাম, ছেতনাই, তালমা, গবরা এই ৬টি নদীর ১৩৩ জন দখলদার প্রায় ৪০ একর জমি দখল করে রেখেছে বলে নদী রক্ষা কমিশনের তালিকায় প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এই তালিকা মানতে নারাজ স্থানীয় পরিবেশবাদীরা। তাদের দাবি, প্রায় সব নদীতেই দখলদার রয়েছে। তাই নদী কমিশনের এই তালিকা সঠিক নয়।

অভিযোগ রয়েছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজসে শক্ত শেকড় গেড়েছেন এসব দখলদার। এদিকে নদী পাড়ে গড়ে ওঠা শহর, হাট বাজারের ময়লা আবর্জনা অপরিকল্পিতভাবেই নদীতে ফেলা হচ্ছে। এ ব্যাপারেও প্রশাসানের কোন উদ্যোগ নেই। অন্যদিকে অভিযোগ উঠেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ড নদী দখলমুক্ত করার নামে শুধু দরিদ্রদের উচ্ছেদ করছে। প্রভাবশালীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা ও প্রশাসনের যোগসাজশে নদী দখল করে তুলেছেন স্থায়ী স্থাপনা, গড়েছেন বাগান, নির্মাণ করেছেন বিনোদন পার্ক।

পঞ্চগড় জেলা শহরের তালমা এলাকায় প্রশাসনের নাকের ডগার সামনেই তালমা নদীর প্রায় সাড়ে ৮ একর জমি দখল করে বিনোদন পার্ক গড়ে তুলেছেন এক ব্যবসায়ী। বাংলো, সুইমিং পুল, শিশুদের বিভিন্ন রাইডিং, জীবজন্তুর প্রতিকৃতিসহ নদীর উপর স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। তার পাশেই প্রায় সাড়ে ৭ একর জমি দখল করে স্থাপনা তুলেছে অপর একটি কোম্পানি। ওই নদীর কিছু অংশ দখল করে সীমানা প্রাচীর তুলেছেন জেলা কৃষকলীগ নেতা।

বোদা উপজেলায় করতোয়া ও পাম নদীর তিন একরেরও বেশি জমি দখল করে ইউক্যালিপটাসসহ বিভিন্ন গাছেন বাগান করা হয়েছে। অথচ এসব প্রভাবশালী দখলদারদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাই নিতে দেখা যায়নি প্রশাসনকে। এছাড়া নদী রক্ষা কমিশনের তালিকায় বড় বড় প্রতিষ্ঠান ও প্রভাবশালীদের নামও রয়েছে।

এদিকে শহর হাটবাজারের আশে পাশে প্রবাহমান প্রায় সব নদীতেই ফেলা হচ্ছে ময়লা আবর্জনা। জেলা শহরের করোতোয়া নদীতে রাতের অন্ধকারে ময়লা আবর্জনা ফেলছে হোটেল মালিকেরা। তেঁতুলিয়া উপজেলা শহরে গোবরা, বোদায় পাম, এবং দেবীগঞ্জ উপজেলা শহরের ময়লা আবর্জনা করোতোয়া নদীতে ফেলা হচ্ছে। ফলে এসব নদী সংকুচিত হয়ে প্রায় মৃত নদীতে পরিণত হয়েছে। অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের ফলে মরে গেছে ডাহুক নদী। ভারত থেকে বয়ে আসা এই নদীটি এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের করা নদী দখলদারদের তালিকা ধরে সারা দেশের মতো পঞ্চগড়েও গত ২৩ ডিসেম্বর উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসন। ওই দিনই পঞ্চগড় জেলা শহরের করতোয়া নদীর তুলারডাঙ্গা বাঁধ ঘেঁষে গড়ে তোলা ৯৬টি দরিদ্র পরিবারের ঘরবাড়ি উচ্ছেদ করেই অভিযানের ইতি টানেন সংশ্লিষ্টরা। অথচ নদী রক্ষা কমিশনের প্রকাশিত নদী দখলদারদের তালিকায় থাকা পঞ্চগড়ের প্রভাবশালীদের স্থাপনা উচ্ছেদে পানি উন্নয়ন বোর্ড কোন উদ্যোগ নেয়নি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন পঞ্চগড়ের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন পঞ্চগড়ের নদী দখলদারদের যে তালিকা প্রকাশ করেছে তা সম্পূর্ণ নয় বলে আমরা মনে করি। পঞ্চগড়ের প্রত্যেকটি নদীতেই দখলদার রয়েছে। এছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড ও প্রশাসন যে অভিযান পরিচালনা করছে সেটিকে নামমাত্র বলাই ভাল। নদীতে চাষাবাদের ফলে নদীর মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী বিলুপ্তির দিকে। আমাদের দাবি, নদী বাঁচানোর স্বার্থে পঞ্চগড়ের প্রত্যেক নদী থেকেই দখলদারদের উচ্ছেদ করে নদীর স্বাভাবিক গতিধারা ও প্রকৃতি ফিরিয়ে দিতে হবে।

অভিযোগ অস্বীকার করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান বলেন, শীতের কারণে আমরা উচ্ছেদ অভিযান স্থগিত রেখেছিলাম। ক্রমান্বয়ে প্রত্যেক নদীর দখলদারদের উচ্ছেদ করা হবে। সে যতই প্রভাবশালী হোক।