রংপুর সংবাদ » প্রতিষ্ঠানে নেই কোনো শিক্ষার্থী, তবু এমপিওভুক্ত

প্রতিষ্ঠানে নেই কোনো শিক্ষার্থী, তবু এমপিওভুক্ত


রংপুর সংবাদ নভেম্বর ২, ২০১৯, ৩:০০ অপরাহ্ন
প্রতিষ্ঠানে নেই কোনো শিক্ষার্থী, তবু এমপিওভুক্ত

বছরের পর বছর ত্যাগ স্বীকার করেও প্রতিষ্ঠিত কিছু প্রতিষ্ঠান পায়নি এমপিওভুক্তির সুযোগ। অথচ দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যত কোনো কর্মকাণ্ড না থাকলেও পেয়েছে এমপিও ভুক্তি। এমন ঘটনা ঘটেছে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলায়। কার ইশারায় এমন অনুমোদন মিলল তা নিয়ে সমালোচনায় মুখর এলাকাবাসীসহ খোদ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের।

গত ২৩ অক্টোবর জেলায় ৪০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্তির আওতায় নিয়ে আসা হয়। এরমধ্যে ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় হয়েছে ৫টি প্রতিষ্ঠান। এই ৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুটি প্রতিষ্ঠানের কার্যত কোনো অস্তিত্ব নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুটির নেপথ্যে রয়েছেন প্রভাবশালী ফেরদৌসুল আরেফিন। তার নিজের ছোট ভাই অধ্যক্ষ আল-মামুনের প্রতিষ্ঠান এফএ টেকনিক্যাল অ্যান্ড আইটি ইন্সটিটিউট এবং চাচা অধ্যক্ষ মোদ্দাছেরুল ইসলামের প্রতিষ্ঠান এফএ মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড আইটি ইন্সটিটিউট পেয়েছে এমপিওভুক্তির অনুমোদন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার সোনাহাট ঘুন্টির মোড়ে উপমা মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড আইটি ইনস্টিটিউট নামে সাইনবোর্ডসহ একটি টিনশেড ভবন রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের নাম রাতারাতি পরিবর্তন করে অনুমোদনপ্রাপ্ত এফএ মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড আইটি ইন্সটিটিউটের নামে একটি নতুন করে ব্যানার লাগানো হয়। টিনশেড এই প্রতিষ্ঠানে নেই কোনো শিক্ষার্থী। নেই ক্লাস চালানোর মত কারিগরি উপকরণ। কাগজ কলমে পরিচালনা হলেও পরিত্যক্ত এই প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্তি তালিকায় কিভাবে আসলো এ নিয়ে জনমনে রয়েছে প্রশ্ন।

এলাকার অধিবাসী কামরুল, হাসান ও সাইফুল ইসলাম জানান, এফএ মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড আইটি ইন্সটিটিউটের নামে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। তবে ৫ বছর পূর্বে এখানে এফএ টেকনিক্যাল অ্যান্ড আইটি ইন্সটিটিউট নামে একটি প্রতিষ্ঠান খোলা হয়। তবে প্রতিষ্ঠানে ছিল না কোনো ছাত্র-ছাত্রী। দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল ভবনটি। এই প্রতিষ্ঠানের মালিক দাবি করেন ফেরদৌসুল আরেফিন। তিনি নিজেই দিয়াডাঙ্গা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও অধ্যক্ষ।

বর্তমানে ভবনটিতে ক্লাস পরিচালনার জন্য নেই কোনো বেঞ্চ, বোর্ড কিংবা পাঠদানের সরঞ্জামাদি। প্রতিষ্ঠানের নামে ১৯০ জন শিক্ষার্থী, ৪ জন শিক্ষক ও ৬ জন স্টাফ রয়েছে বলে কাগজে-কলমে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিষয়গুলো স্বীকার করে এফএ মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড আইটি ইন্সটিটিউটের অধ্যক্ষ মোদ্দাছেরুল ইসলাম জানান, এই প্রতিষ্ঠানের মূল জায়গায়টি বর্তমানে পরিত্যক্ত রয়েছে। শুরুতে উপমা মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড আইটি ইন্সটিটিউট থাকলেও তাদের কোনো শিক্ষার্থী না থাকায় এটি বন্ধ হয়ে যায়। গত এক বছর ধরে এই টিনশেড ভবনটি মাসিক ১০ হাজার টাকায় ভাড়া নিয়ে আমরা ক্লাস চালাচ্ছি।

অপরদিকে ভূরুঙ্গামারী গরুর হাটের পাশে রয়েছে জরাজীর্ণ পরিত্যক্ত একটি ভবনটি। যার নেই কোনো দরজা ও জানালা। ভেতরে রয়েছে গরুর গোবর, খড়কুটো ও জুয়া খেলার সরঞ্জামাদি। ভবনটিকে এফএ টেকনিক্যাল অ্যান্ড আইটি ইন্সটিটিউট নাম দেখিয়ে এবার এমপিওভুক্ত করা হয়েছে।

স্থানীয়রা জানায়, রাত নামলেই ভবনটি মাদকাশক্তদের অপকর্মের আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেখানে শিক্ষক নেই, শিক্ষার্থী নেই, ক্লাস হয় না, সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিভাবে এমপিওভুক্তির তালিকায় স্থান পায় তা নিয়ে প্রশ্ন এলাকাবাসীর।

এফএ টেকনিক্যাল অ্যান্ড আইটি ইন্সটিটিউটের অধ্যক্ষ আল-মামুন জানান, প্রতিষ্ঠানে ৪৫০ জন শিক্ষার্থী ও ১২ জন শিক্ষক দেখানো হলেও এর নেপথে রয়েছে অন্য কাহিনী। এই প্রতিষ্ঠানে নেই কোনো ল্যাব ও কম্পিউটার। এফএ টেকনিক্যাল অ্যান্ড আইটি ইন্সটিটিউটের মালিক ফেরদৌসুল আরেফিন পরিত্যক্ত ভবনের কথা স্বীকার করলেও বলেন কাগজপত্র সব ঠিকঠাক রয়েছে।

তিনি আরও জানান, ছাত্র-ছাত্রী না পাওয়ায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে এনে ভর্তি দেখানো হয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কখনই শতভাগ দেখানো সম্ভব নয়। তবে যখন পরিদর্শনে আসে তখন সেগুলোই দেখানো হয়।

এ ব্যাপারে ভূরুঙ্গামারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আইবুল ইসলাম জানান, প্রতিষ্ঠান প্রধানগণ অনলাইনের মাধ্যমে সরাসরি মন্ত্রণালয়ে কাগজপত্র জমা প্রদান করেন। এখানে আমাদের মনিটরিংয়ের কোনো সুযোগ নেই। আমাদেরকে এ ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

ঘটনার বিষয়ে ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএইচএম মাগফুরুল হাসান আব্বাসী জানান, এই উপজেলায় ৫টি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়েছে। এরমধ্যে ১-২টি নাম সর্বস্ব বলে এলাকায় একটি অভিযোগ উঠেছে। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ চাইলে আমরা তদন্ত করে প্রকৃত কারণ জেনে সত্য উদঘাটন করতে পারবো।

এ ব্যাপারে জেলা শিক্ষা অফিসার শামছুল আলম বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী ৪টি শর্ত পূরণ করলে এমপিও পাওয়া যায়। অনলাইনে কেউ মিথ্যা তথ্য দিয়ে থাকলেও সরকার বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখে পুর্ণবিবেচনা করবেন এবং ব্যবস্থা নেবে।

গত ২৩ অক্টোবর ঘোষিত এমপিওভুক্ত তালিকা অনুযায়ী কুড়িগ্রামের ৯টি উপজেলায় ৪০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি হয়েছে। এরমধ্যে ভূরুঙ্গামারীতে-৫টি, চিলমারীতে ২টি, উলিপুর, রাজারহাট, এবং রৌমারীতে ১টি করে। মাদ্রাসা আলিম স্তর নাগেশ্বরী ও রাজিবপুরে ১টি করে। মাদ্রাসা দখিল স্তর সদর, ভূরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ি, রাজারহাটে ১টি করে। মাধ্যমিক স্তরে রৌমারীতে ৭টি, ভূরুঙ্গামারী ও উলিপুরে ২টি করে, চিলমারী, রাজিবপুর, রাজারহাট এবং সদরে ১টি করে।

নিম্ন মাধ্যমিক স্তরে রৌমারীতে ২টি, উচ্চ মাধ্যমিক (স্কুল এন্ড কলেজ) ফুলবাড়িতে ১টি। উচ্চ মাধ্যমিক (কলেজ) নাগেশ্বরীতে ১টি। কৃষি প্রতিষ্ঠানে রাজারহাট, উলিপুর, রৌমারীতে ১টি করে। ভোকেশনাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রৌমারীতে ২টি।