রংপুর সংবাদ » পাপিয়ার পাপী হয়ে ওঠার গল্প (ভিডিও)

পাপিয়ার পাপী হয়ে ওঠার গল্প (ভিডিও)


রংপুর সংবাদ ফেব্রুয়ারী ২৭, ২০২০, ৮:৪৫ পূর্বাহ্ন
পাপিয়ার পাপী হয়ে ওঠার গল্প (ভিডিও)

নিউজ ডেস্কঃ গত কদিন থেকেই টক অব দ্যা কান্ট্রি পাপিয়া গ্রেফতার। তার গ্রেফতারের পর থেকেই যে বিষয়গুলো বেরিয়ে এসেছে তা যেন হার মানাচ্ছে আরব্য রজনীর মালিকা হামিরা ও মেহেরাঙ্গেজ চরিত্র গুলোকেও। কৌশল তার রাজনীতিবিদদের সঙ্গে ছবি তুলে নিজের অবস্থান জানান দেয়া। পরিচিতির সঙ্গে বাড়ে তার অপরাধ জগতের পরিধিও। প্রভাব খাটিয়ে বনে যান যুব মহিলা লীগ নরসিংদী জেলার সাধারণ সম্পাদক। এ যেন তার হাতে আলাদীনের চেরাগ। কয়েক মাসের মধ্যেই অন্ধকার জগতে বিশাল সম্রাজ্য গড়ে তুলে কামিয়েছে কোটি কোটি টাকা। তিনি শামিমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউ। এমন কোনো অপরাধ নেই যা করেননি এই পাপিয়া।

রাজনীতিতে নাম লেখানোর আগে অনেকটা সাধারণ ঘরের সন্তান পাপিয়া সাধারণ জীবনেই অভ্যস্ত ছিলেন। বিয়ের পর স্বামী মফিজুর রহমান সুমনের হাত ধরে রাজনীতি ও অপরাধকাণ্ডে জড়ান পাপিয়া। কয়েক বছর আগে স্বামীকে নিয়ে এলাকা ছাড়েন তিনি। ঢাকায় এসে গড়ে তোলেন নিরাপদ আস্তানা। এর আগে সাত বছর আগে প্রেম করে পাপিয়া বিয়ে করেন সুমনকে। স্বামী স্ত্রী দুজনেই ছিলেন উচ্ছৃঙ্খল জীবনে অভ্যস্ত।

ঢাকায় আসার পর বদলে যায় পাপিয়ার জীবন। খুব দ্রুত তিনি গড়ে তোলেন সম্পদের পাহাড়। চলাফেরা করেন সামনে পিছনে গাড়ির বহর নিয়ে। কি নেই তার! বিলাসবহুল গাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট। আছে দেশে বিদেশে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা থেকে শুরু করে মাদক ব্যবসা, জাল নোটের ব্যবসা, তদবিরবাজি, চাঁদাবাজি, জিম্মি করে টাকা আদায়, নারীদের দিয়ে অনৈতিক ব্যবসা, অশ্লীল ভিডিও দিয়ে ব্ল্যাকমেইলিং,অন্ধকার জগতের সব পথেই পা দিয়েছেন তিনি। ধীরে ধীরে হয়ে উঠেন অপরাধ জগতের রানী। পূর্ণ করেছেন অন্ধকার জগতের ষোলকলা।

গত শনিবার স্বামী-সহযোগীসহ গ্রেফতার হন পাপিয়া। গ্রেপ্তারের পর পাপিয়ার অন্ধকার জগতের ব্লু প্রিন্ট প্রকাশ করে র‍্যাব। মাসের পর মাস ব্যবহার করেছেন পাঁচ তারকা হোটেলের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।

শনিবার দিল্লী যাবার সময় র‍্যাবের একটি টিম শামিমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউ তার স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরী ওরফে মতি সুমন ও তাদের সহকারী সাব্বির খন্দকার ও শেখ তায়্যিবাকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আটক করে। পাপিয়ার প্রধান ব্যবসাই ছিল এসকর্ট সার্ভিস। চাকরি দেবার প্রলোভন দেখিয়ে সে দেশের বিভিন্ন স্থানের নারীদের ঢাকায় নিয়ে আসতো। তাদের কখনও তার বাসায় আবার কখনও পাঁচ তারকা হোটেলে রেখে অনৈতিক কাজে বাধ্য করতেন। ইচ্ছা না থাকলেও অনেক তরুণীকে বাধ্য করা হতো এসব কাজে।

পাপিয়া টার্গেট করে কম বয়সী কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণীদের সংগ্রহ করতো। পাপিয়াকে আটকের পর সাত তরুণীর তথ্য পাওয়া গেছে যারা গাজীপুর ও নরসিংদী এলাকার শিক্ষার্থী। পাপিয়া তার হেফাজতে থাকা তরুণীদের ভালো ছবি, বয়স, উচ্চতা, পেশা,শারীরিক গঠনের বর্ণনা দিয়ে প্রথমে অভিজাত ক্লায়েন্টের কাছে পাঠিয়ে দিত। ক্লায়েন্টের বাসায় বা হোটেলে তরুণীদের পৌঁছে দেবার কাজ করতো পাপিয়ার স্বামী সুমন ও তার সহকারী সাব্বির খন্দকার। পাপিয়ার আস্তানায় কেউ এসে তরুণীদের সঙ্গে মেলামেশা করলে কৌশলে গোপনে ভিডিও ধারণ করা হতো। ক্লায়েন্ট চলে যাবার পর এসব অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ও ছবি দিয়ে তাদের ব্ল্যাকমেইল করা হতো। ভিডিও-ছবি প্রকাশ করার ভয় মাসের পর মাস দেখিয়ে হাতিয়ে নিত লাখ লাখ টাকা।

র‍্যাব সূত্র জানিয়েছে, পাপিয়া ও সুমন চলাফেরা করতো অভিজাত লোকদের সঙ্গে। পাঁচতারকা হোটেলে বসেই তাদের সঙ্গে আড্ডা দিতো তারা। গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ওয়েস্টিন হোটেলের ২১তলার প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুটের চারটি রুম ভাড়া করে পাপিয়া, সুমন ও তাদের সহযোগীরা অবস্থান করছিল। ভিআইপিদের জন্য পাপিয়া পুরো একটি বারই বুকিং দিয়ে রাখতেন। বারের আড্ডায় সমাজের বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকতেন। র‍্যাব জানিয়েছে, তিন মাসে পাপিয়া অন্তত তিন কোটি টাকা হোটেল বিলই পরিশোধ করেছে।

র‍্যাব জানিয়েছে, পাপিয়া ও সুমন নরসিংদী এলাকায় তাদের নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী কিউ এন্ড সি গড়ে তুলে। তাদের প্রত্যেকের হাতে কি এন্ড সি ট্যাটু করা  আছে। তারা পাপিয়া ও সুমনের নির্দেশে বিভিন্ন রকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে। ভিন্ন মতের ব্যক্তিদের টর্চার সেলে নিয়ে নির্যাতন করতো। পাপিয়া ও তার স্বামী সুমনের নামে ঢাকা, নরসিংদী ও গাজীপুরে বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। কোনও সুনির্দিষ্ট ও দৃশ্যমান পেশা ছাড়াই তারা এই বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকের হিসাবে তাদের রয়েছে লাখ লাখ টাকা।

হঠাৎ করে পাপিয়াকে গ্রেপ্তার নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। পাপিয়া গ্রেপ্তারের পর তার বিরুদ্ধে র‍্যাবসহ অন্যান্য সংস্থার পক্ষ থেকে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসছে, হচ্ছে মামলা। এ ঘটনা আবারও জানান দিল আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। এখন দেখার বাকি শেষ পর্যন্ত কি হয়। আমরা চাই না এ ধরণের আর কোনো অসঙ্গতি বিরাজমান থাকুক আমাদের এ সমাজে।