রংপুর সংবাদ » আওয়ামী লীগে শাপমোচন কীভাবে

আওয়ামী লীগে শাপমোচন কীভাবে


রংপুর সংবাদ নভেম্বর ৯, ২০১৯, ২:৪২ অপরাহ্ন
আওয়ামী লীগে শাপমোচন কীভাবে

নঈম নিজাম:


‘ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস আজকে হলো সাথী, সাত মহলা স্বপ্নপুরীর নিভলো হাজার বাতি, রুদ্ধ বীণার ঝংকারেতে ক্ষুব্ধ জীবন উঠলো মেতে, সকল আশার রঙিন নেশা… ঝড় উঠেছে।’ ছবির নাম শাপমোচন। নায়ক উত্তম কুমার আর নায়িকা সুচিত্রা সেন। হারানো দিনের বাংলা ছবি। ছবির কাহিনি অভিশাপ নিয়ে বেঁচে থাকা এক অভিশপ্ত পরিবার নিয়ে। উত্তম কুমারের পূর্বপুরুষ গান শেখেন এক গুরুর কাছে। অসাধারণ গানের গলা। সুরের ঝংকারে চারপাশ তছনছ হয়ে যেত। একদিন এক গানের অনুষ্ঠানে গান করছেন, সেই সময় সেই গুরু এসে হাজির। শিষ্যকে গান করতে দেখে আবেগে আপ্লুত হলেন গুরু। আনন্দ আর উচ্ছ্বাস নিয়ে হৈচৈ করে বললেন, আমার শিষ্য এত ভালো গান করছে! উপস্থিত সবাই একটু বিরক্ত হলেন। গায়কী পরিবেশে এভাবে গুরুকে আশা করেননি গানের শিষ্য। এ নিয়ে একটু কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে গানের গুরুকে অস্বীকার করলেন শিষ্য। ক্ষুব্ধ ব্যথিত গুরু অভিশাপ দেন, তুমি আমাকে অস্বীকার করছ! অভিশাপ দিলাম তোমাকে। আর কোনো দিন গান করতে পারবে না। তোমার বংশেরও কেউ গান করতে পারবে না। আর যদি কেউ গান করেও সঙ্গে সঙ্গে গলায় রক্ত উঠে মারা যাবে। অথবা চিরতরে পঙ্গু হয়ে যাবে। কেউ কেউ কুসংস্কার হিসেবে দেখলেও বাস্তবে এই অভিশাপ লেগে গেল। উত্তমের পূর্বপুরুষরা গান করলেই বিপদে পড়তেন। এমনকি তার আপন দাদাও। উত্তম কুমারের গলাটা ভালো। লুকিয়ে একটু-আধটু গান করতেন। জীবন-জীবিকার তাগিদে বাবার বন্ধুর বাড়িতে কলকাতা যাওয়ার পথে বাস্তবতা বুঝে বড় ভাই পরিবারের অতীত ইতিহাস জানালেন। তারপর বললেন, জীবনেও গান করবে না। গান করলেই সমস্যা হবে। চিরচেনা গ্রাম ও দাদা, বউদি, ভাতিজা, বন্ধুদের রেখে উত্তম চলে গেলেন কলকাতায়। কলকাতায় বাবার বন্ধুর বাড়িতে উঠলেন। প্রথম দিনেই বিত্তশালী পরিবারে এসে হোঁচট খান উত্তম। কিছুটা অপমানিতও হন। আর অপমানটা আসে মাধুরী মানে সুচিত্রাকে যিনি বিয়ে করতে চান তার কাছ থেকে। অপমানিত অবস্থানে বাবার বন্ধুর গ্রাম থেকে আসা ছেলেকে দেখে তার পক্ষ নেন সুচিত্রা। তারপর প্রথম সাক্ষাতেই বললেন, জানেন না আমরা বড়লোক। এ বাড়িতে উঠলেন কেন? বিস্ময় নিয়ে তাকালেন উত্তম। নিজের হবু স্বামীর কাজকর্ম সুচিত্রার পছন্দ নয়। তাই অনেকটা শোধ নিতেই উত্তমকে শহুরে বানানোর চেষ্টায় নেমে পড়েন। সুচিত্রা জানতেন না উত্তমের গানের প্রতিভার কথা। গানের প্রতি সুচিত্রারও অনেক ঝোঁক। ওস্তাদ রেখে তিনিও গান শেখেন।

জামাকাপড়ে পরিবর্তন এলো উত্তমের। এর মাঝে একদিন সুচিত্রার সঙ্গে বেড়াতে বের হন। সুচিত্রার কাছ থেকে বের হয়ে হঠাৎ রাস্তায় পড়ে থাকা একজন অসুস্থ মানুষকে বাড়ি পৌঁছে দেন উত্তম। জানতে পারেন এই মানুষটির কষ্টের কথা। তারপর তার পাশে দাঁড়ান। সহায়তা করেন। কিন্তু মানুষটা ছিল লোভী। নিজের নাতনিকে পারলে বিক্রি করে দেয়। উত্তম এটা জানতেন না। না জেনেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। চাকরির খোঁজে আরেকদিন বের হয়ে ঘুরতে ঘুরতে অসহায় মানুষটির বাড়িতে এসে দেখেন, দাদা-নাতনিকে বের করে দিচ্ছেন বাড়িওয়ালা। বাড়ি ভাড়া না দিতে পারাই অপরাধ। মাত্র ১০ টাকা হলেই ওরা আবার বাড়িতে থাকতে পারে। এই টাকার জন্যই সুরের ঝংকারে ফিরে আসেন উত্তম। রাতে বাড়ি ফিরে নিজে নিজে সুরের করুণ মূর্ছনার ঝড় তোলেন। সুরের এই ঝড় শুনে বিস্মিত হন সুচিত্রা। বেহালার এই করুণ সুর কার? এমন সুরের মানুষ কী করে নিজেকে আড়াল করে রাখে! সামনে এলেন সুচিত্রা। তারপর বললেন, এত দিন কেন নিজেকে লুকিয়ে রেখেছ? বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে জানতে চান, কী এমন দুঃখ। তারপর বলেন, আজ তুমি যা চাও সব দেব উজাড় করে। আবেগে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে। চোখের চাউনিতে ভালোবাসার সমুদ্র। জবাবের অপক্ষোয় তাকালেন উত্তমের দিকে। উত্তম দুঃখভরা চাউনি নিয়েই বললেন, কিছু না ১০টা টাকা দিতে পারবে আমাকে? এ কেমন চাওয়া! সুচিত্রা বিস্ময় আর বেদনায় নীল হয়ে গেলেন। বললেন, আমার কাছে এই তোমার চাওয়া! কান্না আর থামাতে পারলেন না। খান খান হয়ে যাওয়া হৃদয়কে সামলাতে চলে গেলেন সামনে থেকে। পরদিন ভোরে অনেক টাকা হাতে নিয়ে এসে দেখলেন, পাখি উড়ে গেছে। উত্তম নেই। বাড়ি থেকে বের হয়ে গেছেন। ভেঙে পড়লেন সুচিত্রা। এদিকে টাকার সন্ধানে বের হয়ে উত্তম দেখেন, রাস্তায় এক ভিখারি গান করছে। মানুষ তাকে অর্থ দিচ্ছে। একটি পরিবারকে সাহায্য করতে ১০ টাকার জন্যই উত্তম ভুলে গেলেন পারিবারিক অভিশাপের কথা। রাস্তার ফুটপাথে দাঁড়িয়ে গান ধরলেন, ‘শোনো বন্ধু শোনো, প্রাণহীন এই শহরের ইতিকথা… ইটের পাঁজরে লোহার খাঁচায় দারুণ মর্মব্যথা, এখানে আকাশ নেই, এখানে বাতাস নেই, এখানে অন্ধ গলির নরকে মুক্তির আকুলতা…।’ গান শুনতে ভিড় জমে যায় ফুটপাথে। সবাই পয়সা দেয়। ফুটপাথে পাওয়া সেই অর্থ তুলে দেন অসুস্থ পরিবারটিকে। এর মাঝে কাজ ও বাসা খুঁজতে গিয়ে ওঠেন এক মেসে। সেখানেই খুঁজতে খুঁজতে একদিন আসেন সুচিত্রা। তারপর উত্তমকে নিয়ে যান রেকর্ডিং কোম্পানির কাছে। উত্তম তার অভিশাপের কথা জানান। সুচিত্রা বললেন, ওসব কুসংস্কার। আমি তোমার পাশে আছি। সুচিত্রার আহ্বানে সুর তুললেন উত্তম, ‘বসে আছি পথ চেয়ে ফাগুনেরও গান গেয়ে, যত ভাবী ভুলে যাব মনও মানে না… মনও মানে না।’ অসাধারণ আরেকটি গান।

এদিকে গ্রামের বাড়িতে বসে উত্তমের দাদা ভাইয়ের গান শোনেন বেতারে। উত্তম গাইছেন, ‘সুরের আকাশে তুমি যে গো সুখতারা…’ ভাইয়ের এই পরিবর্তনে ভীত হলেন গ্রামে থাকা দাদা। তারপর অভিশাপের কথা মনে করে ভাইয়ের জন্য চিৎকার করতে থাকেন। একপর্যায়ে উত্তমের অন্ধ এই দাদা মারা যান। এদিকে সুচিত্রার বিয়ে ঠিক করেন বাবা। জমিদার শ্বশুরপক্ষ আসেন আশীর্বাদ করতে। সুচিত্রা সেন জানান, তার বিয়ে হয়ে গেছে। সুচিত্রার বউদি সব শুনে বলেন, ‘মরেছিস পোড়ামুখি’। জবাবে সুচিত্রা বলেন, ‘একেবারেই মরেছি’। উত্তমের কাছে ছুটে আসেন সুচিত্রা সেন। এসে দেখেন অভাবী পরিবারটির সেই মেয়েটিকে। এই মেয়ে উত্তমকে দাদা ডাকত। অভাবের তাড়নায় তাকে বিক্রির চেষ্টা চলছিল। পালিয়ে এসে উত্তমের সাহায্য চায়। কিন্তু তাকে দেখেই ভুল বুঝে চলে যান সুচিত্রা। এদিকে দাদার অবস্থা খারাপ শুনে সেই মেয়েটিকে রেখে দ্রুত গ্রামে চলে আসেন উত্তম। এসেই জানলেন দাদা নেই। ভাইয়ের শোক কাটানোর আগে ভয়ঙ্কর অসুস্থ হন উত্তম। সবাই ভাবল, গানের সেই অভিশাপের কারণেই অসুস্থতা। উত্তমকে খুঁজে ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে নতুন সমস্যায় পড়েন সুচিত্রা। মেসের লোকজন তাকে জানায়, মহেন্দ্র মানে উত্তম সেই মেয়েকে নিয়ে চলে গেছেন। ভেঙে পড়লেন সুচিত্রা। চুরমার হয়ে যায় আশার সকল আলো। বাবাকে বললেন, এবার বিয়ে ঠিক করে ফেলো। প্রস্তুতির মাঝে কাকার করুণ অবস্থার কথা জানাতে উত্তমের ছোট ভাতিজা গ্রাম থেকে শহরে আসে। সুচিত্রাকে আকুতি জানায় তার সঙ্গে গ্রামে যাওয়ার জন্য। অভিমানী সুচিত্রার না যাওয়ার কথা শুনে ছেলেটি বলল, তোমার কথায় গান করে কাকু আজ মারা যাচ্ছেন। মৃত্যুর আগে শেষবারের মতো তোমাকে দেখতে চাইছেন। এ আহ্বানে গাড়ি নিয়ে গ্রামে আসেন সুচিত্রা। দেখেন সত্যি সত্যি মৃত্যুর মুখোমুখি উত্তম। বউদি জানান, মহেন (উত্তম) বলেছে, মাধুরী বলেছিল অভিশাপ লাগবে না গান করলে। ও গান করার পর দাদা মারা গেছে। এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ডাক্তার বলছে ভগবানকে ডাকতে। ঠাকুরের কাছে প্রার্থনায় বসেন মহেনের বউদি। অবস্থা দেখে সুচিত্রা শহর থেকে ভালো ডাক্তার আনতে লোক পাঠান। উত্তমের কোনো হুঁশ নেই। অবস্থা খারাপ দেখে সুচিত্রা বার বার বলতে থাকেন, আমি এই অভিশাপ বিশ্বাস করি না। একপর্যায়ে বাড়িতে দীর্ঘদিন থেকে পরিবারের সংরক্ষণ করে রাখা অভিশাপের কেন্দ্রবিন্দু সেই তানপুরা ভেঙে ফেলেন। তানপুরা ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই কথা বলে ওঠেন মহেন। শাপ মোচন হয়। শহর থেকে ডাক্তারও আসেন। সেবা-শুশ্রƒষা চলতে থাকে। ভুল বোঝাবুঝিরও অবসান হয়। শাপমোচন ছবির কথা মনে পড়ল দেশের বর্তমান অবস্থা দেখে। আমার মনে হলো, সিনেমার শাপমোচনের মতো আওয়ামী লীগেও এমন একটি ঝড়ের দরকার ছিল। প্রয়োজন ছিল সবকিছু তছনছ করার। জীবন চলার পথে অনেক সময় একটি ঝাঁকুনি অনেক কিছু করতে পারে। দল ও সরকার বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন শেখ হাসিনা। শাপমোচনের এই শুদ্ধি অভিযানই পারে আওয়ামী লীগকে সঠিক অবস্থানে নিয়ে যেতে।

আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে এ দলটির ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। কোনো নেতা আসমান থেকে পয়দা হয় না। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম রাজনীতির মাঝেই নেতা সৃষ্টি হয়। কিন্তু সবকিছু বদলে গেছে। এখন উড়ে এসে জুড়ে বসে নেতারাই দাপট নিয়ে চলছে। ক্ষমতার রাজনীতি যেন উড়ে এসে জুড়ে বসা নেতা তৈরির কারখানা আর ওরাই বারোটা বাজাচ্ছে দল ও সরকারের। তাদের পাল্লা ভারী হওয়ায় ছাত্রলীগ ব্যস্ত ছিল চাঁদাবাজি নিয়ে। যুবলীগ ব্যস্ত ছিল ক্যাসিনোকান্ডে। স্বেচ্ছাসেবক লীগ দেখল বসে থেকে লাভ নেই। তাই তারাও অনেক ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ হয়ে যায় নীরব, নিস্তব্ধ। হাইব্রিডরা যা খুশি তা করতে থাকে। কিন্তু এভাবে তো দীর্ঘ মেয়াদে চলতে পারে না। গত ১০ বছর ধরে অনেক কিছু বলেছি। আমাদের কথা শুনে অনেকে মন খারাপ করেছেন। অনেকে সমালোচনাও করেছেন। কিন্তু নিজেদের অবস্থান থেকে এক দিনের জন্যও সরিনি। রাজনীতির দেউলিয়াত্ব শুধু নয়, ক্যাসিনো জুয়াকা- নিয়েও তিন-চার বছর ধরে লিখছি। কেউ কান দেয়নি। কমিটি বেচাকেনার কথাও বার বার বলেছি, লিখেছি; কেউ পাত্তা দেয়নি। বরং পারলে আমাদের নিয়েই প্রশ্ন তোলে। বুঝতে পারি এক দিনে সবকিছু এমন হয়নি। মন্ত্রী আর নেতারা এখন প্রশ্ন তুলছেন, কথা বলছেন। প্রশ্ন- কী করে হাইব্রিড প্রবেশ করল? ভাবখানা এমন, তারা কোনো কিছু জানেন না। তারা না জানলে আসমান থেকে হাইব্রিড পয়দা হয়নি। মাটি ফেটে বিএনপি-জামায়াত আসেনি আওয়ামী লীগে। বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ভুল আপনারাই করেছেন। এখন সেই ভুল সংশোধন করুন। রাজনীতিকে স্বাভাবিক গতিতে চলতে দিন। সব বিষয়ে জানালা খুলে দেওয়ার কী দরকার ছিল? বিএনপি-জামায়াত নেতাদের ফুলের মালা দিয়ে মন্ত্রী-এমপিরাই দলে এনেছেন। পদ-পদবি আর অর্থের লোভ-লালসাই সর্বনাশ করেছে। অভিশাপ ডেকে এনেছে দলে, সরকারে। কথায় আছে- লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। এখানেও হয়েছে তাই। সবাই ভেবেছিল কোনো জবাব দিতে হবে না। আল্লাহ নিজেই বলেছেন, জবাবদিহি হাশরের ময়দানে আছে। আর আছে বাস্তবেও। জীবদ্দশায় অনেকে এবার টের পেলেন সবকিছুর শেষ আছে। যা খুশি তা দীর্ঘ মেয়াদে করা যায় না। শাপমোচন করুন। আগামী কাউন্সিলের আগেই ব্যর্থতা দূর করুন। দল ও সরকার নিয়ে নতুন করে ভাবুন। দেখবেন কোনো সমস্যা নেই। সবকিছু স্বাভাবিক গতিতেই চলছে। আইনের শাসন ফিরে এসেছে। নতুন রক্তে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের শাপমোচন হয়ে গেছে।

লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।