রংপুর সংবাদ » একই প্রতিষ্ঠানে দুজন সুপার, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বন্ধ

একই প্রতিষ্ঠানে দুজন সুপার, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বন্ধ


রংপুর সংবাদ নভেম্বর ৯, ২০১৯, ২:৩৭ অপরাহ্ন
একই প্রতিষ্ঠানে দুজন সুপার, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বন্ধ

নীলফামারীর ডোমার উপজেলার মটুকপুর ভোকেশনাল উচ্চ বিদ্যালয়ে দুজন ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট দায়িত্বে থাকায় ভেঙে পড়েছে প্রশাসনিক কাঠামো। এর ফলে গত পাঁচ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা। দীর্ঘ সময় বেতন-ভাতা বন্ধ থাকায় মানববেতর জীবন যাপন করছেন বিদ্যালয়টির ২১ জন শিক্ষক কর্মচারী। সেই সঙ্গে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পাঠদান।

সূত্র জানায়, ভারপ্রাপ্ত সুপাররিনটেনডেন্ট পদে একজন দায়িত্বে থাকার পরেও প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে ফাতিমা এরফানুল ইসলাম নামের আরেক শিক্ষককে একই পদে দায়িত্ব দেওয়ায় সৃষ্টি হয়েছে এই জটিলতা। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা।

জানা গেছে, গত ঈদ উল-আজহায় মুসলিম শিক্ষক-কর্মচারীরা অর্থাভাবে পরিবারের লোকজনকে নতুন জামা-কাপড় কিনতে পারেননি। এছাড়া সনাতন ধর্মালম্বী শিক্ষকেরাও এবার দুর্গা উৎসব থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের ছেলে মেয়েরাও এবার পূজায় নতুন পোশাক পাবেন না।

বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটি সূত্রে জানা গেছে, মটুকপুর ভোকেশনাল উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠাতা সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন আব্দুল মান্নান। এরপর ২০০৩ সালে ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এরফানুল ইসলাম নামের এক শিক্ষককে। তিনি ১২ বছর দায়িত্ব পালন করার পর ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর পারিবারিক সমস্যার কারণ দেখিয়ে পদ থেকে অব্যাহতি নেন। পরদিন ম্যানেজিং কমিটির এক জরুরি সভায় তার অব্যহতিপত্র মঞ্জুর করে দ্বিতীয় জেষ্ঠ্য ট্রেড ইন্সট্রাক্টর মুহা. জাকারিয়াকে ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট পদে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তিনি তা নাকচ করলে তৃতীয় জেষ্ঠ্য ট্রেড ইন্সট্রাক্টর আব্দুল মান্নানকে ওই পদে সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন দেওয়া হয়।

সভার সিদ্ধান্তে আব্দুল মান্নানকে ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট পদে গত  ২০১৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। আব্দুল মান্নান ওই পদে দায়িত্বে থাকাকালীন আট মাস পর গত ২০১৬ সালের ছয় অক্টোবর সাবেক ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট এরফানুল ইসলাম পুনরায় ওই পদে নিয়োগ পেতে আবেদন করেন। ম্যানেজিং কমিটির এক সভায় তার আবেদন না মঞ্জুর করা হয়।

এদিকে চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরিদর্শক আবদুল কুদ্দুস সরদার ১০ কর্মদিবসের মধ্যে একজন জেষ্ঠ্য শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট পদে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার উম্মে ফাতিমার কাছে পত্র দেন। পরে পরিদর্শক আবদুল কুদ্দুস সরদার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে চলতি বছরের ১১জুন ওই আদেশ স্থগিত করে একটি পত্র দেন।

এরই মধ্যে গত ৩ জুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে ফাতিমা ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্ত ছাড়াই এক অফিস আদেশে এরফানুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট পদে দায়িত্ব দেন। পাশাপাশি তাকে দায়িত্ব হস্তান্তরের জন্য ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট আব্দুল মান্নানকে তাগিদ পত্র দেন। যা বিধি বহির্ভূত বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজিং কমিটি। তবে আব্দুল মান্নানও এখন পর্যন্ত দায়িত্ব হস্তান্তর করেননি। ফলে একই প্রতিষ্ঠানে দুজন ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট থাকার কারণে বিদ্যালয়ে প্রশাসনিক কাজে সৃষ্টি হয়েছে নানা জটিলতা। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সৃষ্ট এই জটিলতার বলি হয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ২১জন শিক্ষক-কর্মচারী।

একই প্রতিষ্ঠানে দুজন সুপার, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বন্ধ

একই প্রতিষ্ঠানে দুজন প্রধান থাকায় বিদ্যালয়ে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে

এ জটিলতার কারণে সাধারণ শিক্ষকেরা গত এপ্রিল মাস থেকে বেতন-ভাতা উত্তোলন করতে পারেননি। এ অবস্থায় বেতন-ভাতা না পেয়ে তারা পরিবার পরিজন নিয়ে পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। শিক্ষক-কর্মচারীরা সংসার চালাতে অন্যের কাছে হাত পাততে বাধ্য হচ্ছেন। এ ছাড়াও বিদ্যালয়ে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ায় কেউ কারো কথা মানছেন না। যে যার মতো করে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করছেন। ফলে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়াও লাটে উঠেছে।

সহকারী শিক্ষক আনারুল ইসলাম, ধরনী কান্ত রায়, ট্রেড ইন্সট্রাক্টর বিনীতা রানী রায়, সুবর্ণা রানী রায়, মুহা. জাকারিয়া, ছয়ফুল ইসলাম, নাছিরুল রেজা সরকার জানান, বিদ্যালয়ে একজন ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট থাকা অবস্থায় সভাপতি একক সিদ্ধান্তে আরেকজনকে দায়িত্ব দিয়ে জটিলতার সৃষ্টি করেছেন। এখন তার খেসারত সাধারণ শিক্ষক-কর্মচারীদের দিতে হচ্ছে। বেতন-বোনাস না পাওয়ায় আমরা গত ঈদুল আযহায় স্ত্রী-ছেলেমেয়েদের জন্য কিছুই কিনতে পারিনি। এমনকি আর্থিক সংকটে ঈদে কোরবানি দিতে না পারার লজ্জা কাউকে বলা সম্ভব হয়নি। এদিকে দুর্গা পূজায় বেতন না পেলে বিদ্যালয়ের পাঁচজন সনাতন ধর্মালম্বী শিক্ষক পূজাও করতে পারবেন না বলে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে শিক্ষক এরফানুল হক বলেন, প্রতিষ্ঠানের সভাপতি আমাকে ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট পদে দায়িত্ব দিয়েছেন। আব্দুল মান্নান দায়িত্ব হস্তান্তর না করায় এ পর্যন্ত আমি দায়িত্ব বুঝে পাইনি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ও এডহক কমিটি বলতে কোনোটাই নেই। তাই শিক্ষক-কর্মচারীরা বেতন-ভাতা না পাওয়ায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট আব্দুল মান্নান বলেন, ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্তে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমি নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছি। কমিটির অনুমোদিত সিদ্ধান্ত ও সুপারিশ ছাড়াই সভাপতি নিজ খেয়াল-খুশি মতো এককভাবে কাউকে ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট পদে দায়িত্ব দিতে পারেন না। যেটি তার এখতিয়ার বহির্ভূত। সভাপতি ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত ও সুপারিশ ছাড়াই এককভাবে এরফানুল ইসলামকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট পদে দায়িত্ব দেন। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক।

তিনি আরও বলেন, এডহক কমিটির মেয়াদ গত আট এপ্রিল শেষ হয়েছে। নিয়মিত কমিটি গঠন বা এডহক কমিটি গঠনের বিষয়টি সভাপতিকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে তার কাছ থেকে কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।

এ বিষেয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে ফাতিমা বলেন, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার বিষয়টি সমাধানের জন্য দুজন সুপারের বিষয়ে জেলা প্রশাসক এবং মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। সেখান থেকে নির্দেশনা পেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এ ব্যাপারে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, বিধি বহির্ভূতভাবে কাউকে নিয়োগ দেওয়ার এখতিয়ার কারো নেই। সুপার পদে সৃষ্ট জটিলতায় শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা না পাওয়া দুঃখজনক ও অমানবিক।