রংপুর সংবাদ » সম্পাদকের ডায়েরি,সাগর-রুনি এই নির্লজ্জ জাতিকে ক্ষমা করে দিও

সম্পাদকের ডায়েরি,সাগর-রুনি এই নির্লজ্জ জাতিকে ক্ষমা করে দিও


রংপুর সংবাদ ফেব্রুয়ারী ১১, ২০২০, ৯:২৪ পূর্বাহ্ন
সম্পাদকের ডায়েরি,সাগর-রুনি এই নির্লজ্জ জাতিকে ক্ষমা করে দিও

রেজাউল করিম মানিকঃআজ ১১ ফেব্রুয়ারী হত্যাকান্ডের সাত বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার কাজ শেষ হয়নি..🖊সাহসী এই সাংবাদিক দম্পতি হত্যার বিচার না হলে আগামীতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি আরো বাড়বে।

আমি বাঙালি মধ্যবিত্ত বলছি,
আমি একজন কাপুরুষ বলছি।

ছাপোষা মধ্যবিত্তদের আন্দোলনগুলো সাধারণত হয় স্বপ্নিল আন্দোলন। যেই আন্দোলনে ভয়-ডর নেই, যেই আন্দোলনে রাজপথে থাকার ঝামেলা নেই, যেই আন্দোলনে আমরণ-অনশন নেই, যেই আন্দোলনে পুলিশ এসে বেঁধে নিয়ে যায় না- এসমস্ত আন্দোলনই আমাদের পছন্দ। একটু যদি গতর খাটা লাগে, একটু যদি নিজের কমফোর্ট জোন থেকে বের হয়ে আসার দরকার পড়ে, তাহলেই আর পরেরদিন আমাদের পাওয়া যায় না।

এসবের কারণও আছে। এই দেশে একটা জীবন দাঁড় করাতে অনেক কষ্ট। কোন আন্দোলনে গিয়ে একবার কোন ‘ঝামেলায় পড়ে গেলে’ কিংবা ‘ধরা’ খেয়ে গেলে বহু কষ্টের চাকরিটা চলে যায়, অনেক দিনের সম্মানটা চলে যায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেয়। জীবনের এক একটা বছরের অনেক দাম। একজনের পড়ালেখা শেষ হবার ওপর নির্ভর করে আরেকজনের রিটায়ারমেন্ট। একটা চাকরির ওপর নির্ভর করে অনেকগুলো মানুষের খাওয়া-পরা।

নিজেদের স্বাচ্ছন্দ্যের এলাকায় থাকলে আমরা অনেক বড় বড় কথা বলি। আমাদের কথার ভারে আর মাহত্ত্বে মাঝেমধ্যে ফেসবুক ফেটে যায়। সেটাকে তখন রিপেয়ার করতে হয়। নিজেকে নিরাপদে রেখে বাঘের খাঁচায় ঢিল মারা খুব সহজ, একটু খুঁচিয়ে দেয়াও একরকম আরামের অনুভূতি দেয়। নিজের কাপুরুষ স্বত্বা বুকের খাঁচা ভেঙ্গে বেরিয়ে এসে হুংকার দেয়ার যে আপ্রাণ প্রয়াস চালায়, ফেসবুকে এসে আমরা সেটা উগলে দেই।

এতদূর এসে দেখছি ১৮১ শব্দ লিখে ফেলেছি। এই ১৮১ শব্দ হচ্ছে সাফাই গাওয়া শব্দ। নিজের কাপুরুষ স্বত্বাকে ঢেকে রাখার শব্দ। কথা বলতে এসেছি -সাগর-রুনীকে নিয়ে।
আজ ১১ই ফেব্রুয়ারি সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনির মৃত্যুর ৭ বছর। সাত বছরেও শেষ হয়নি সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত। গ্রেপ্তার হয়নি পরিকল্পনাকারীসহ মূল হোতারা। কয়েকবার তদন্ত সংস্থা পরিবর্তন, বার বার সময় পিছিয়েও দাখিল করা যায়নি চাঞ্চল্যকর এই মামলার চার্জশিট। মামলায় কয়েক জন গ্রেপ্তার হলেও মূল হোতারা রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। মামলার ভবিষ্যৎ ও বিচার নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে বিরাজ করছে ক্ষোভ ও হতাশা। কারা, কি উদ্দেশ্যে তাদের হত্যা করেছে তা আজও অজানা তাদের। জেলার সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীরা মনে করেন, সাহসী এই সাংবাদিক দম্পতি হত্যার বিচার না হলে আগামীতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি আরো বাড়বে।

দেখেছে আমি সেকেন্ড ধরে হিসেব রাখি? প্রতি বছরের ১১ই ফেব্রুয়ারি তারিখ আসলে নিজের ফেসবুক দেয়ালে
কে মনে করিয়ে দেই আজ সাগর-রুনীর হত্যার ৬ বছর হল… আজ ৭ বছর হল…।
ঐ যে বললাম কাপুরুষ মনস। আর কিছু করার জো নেই, আর কিছু করার ক্ষমতা নেই, মনকে তো সান্ত্বনা দিতে হয়, মন তো মানে না। তাই বসে বসে হিসেব করি। বড় গলায় জানান দেই। আর কিছু করার যে মুরোদ নাই।

সাধের মধ্যবিত্ত জীবন, সাধের কমফোর্ট জোনটা যদি পাছে নষ্ট হয়ে যায়।
বন্ধুরা আমার, চিরটা জীবন তো ভীরু কাপুরুষ থেকে গেলাম, আমার মৃত্যুর পরে যদি আপনাদের কারো সুযোগ হয় তাহলে আমার পরিবারে কানে কানে গিয়ে বলবেন আমি দাদার পাশে শুয়ে থাকতে চেয়েছি। খুব বেশি ঝামেলায় না ফেললে আমার লাশটা তারা যেন মেডিক্যালে দিয়ে আসে।

আমি বলতে পারি না। আমি চিৎকার করে বলতে পারি না যে-
সাগর-রুনীকে তোমরা মেরে ফেলেছো, সাগর-রুনীকে আমরা মেরে ফেলেছি। সাগর-রুনী রক্ত আমাদের সকলের হাতে, সাগর-রুনী লাশের ভার আমাদের সকলের বইতে হবে। আজকের কমফোর্ট জোনে থাকা নিষ্ক্রিয় সকল মানুষের বিচার করতে হবে। শুধু ধারালো অস্ত্র দিয়ে দুটো পোচ দিলেই কি খুন হয়? সারা বাংলাদেশের দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা নেয়া মানষের দায় নাই? সাগর-রুনীর মৃত্যুর পরের দিন সারা ঢাকা শহরের মানুষ যে রাজপথে নেমে এসে ধিক্কার জানায় নাই সেটার দায় নাই? দেশের সমস্ত স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মরচে ধরা তরুণদের দায় নাই? সেটার বিচার কে করবে? কোন আদালত?
অর্থহীন এই লেখাটা শেষ করে দেই। শেষে একটা গল্প শোনাই। গল্পের রেফারেন্স দিতে পারবো না, তবে বহুল প্রচলিত বলেই জানি। মুসলিম সাধক মনসুর হাল্লাজ হঠাৎ নিজেকে ‘আনাল হক’ বলে দাবী করে ওঠ যার মানে করলে দাঁড়ায় ‘আমিই সত্য’। এদিইকে আরবীতে হক শব্দের আরেক মানে আল্লাহ। তখনকার মোল্লারা মনসুর হাল্লাজের বিরুদ্ধে শিরকের অভিযোগ ওঠায়। অভিযোগের ফলে অপরাধ অনুযায়ী তার রায় হলো মৃত্যুদন্ড কিন্তু এর স্বপক্ষে ১০১ জন আলেমের স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক। অভিযোগকারীরা ১০০ জন আলেমর স্বাক্ষর গ্রহন করতে পেরেছিল, আর বাকি ১ জন। অভিযোগকারীরা যখন হতাশ তখন মনসুর হাল্লাজ নিজেই ১০১ নম্বর আলেম হিসেবে স্বাক্ষর করেছিলেন। বলেছিলেন ‘তোমরা তোমাদের শরিয়তের নিয়ম পালন কর’। মনসুর হাল্লাজেকে যখন ১০০ টুকরো করে মৃত্যুদন্ড কর্যকর করা হয় তখন তার প্রত্যেকটা টুকরো থেকে ‘আনাল হক’ উচ্চারিত হতে থাকলো।

সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি এবং তার পরবর্তী সমস্ত হত্যাকাণ্ডের পেছনে এই দেশের কোটি কোটি নাগরিকের সাথে আমার নিষ্ক্রিয়তাও দায়ী। এ অভিযোগে সমস্ত শাস্তি আমি মাথা পেতে নেবো। যে কোন মুহূর্তে যে কোন উপায়ে আমার মৃত্যুর আগে এবং পরে আমার জীবনের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য একটাই।
সাগর-রুনী হত্যার বিচার চাই’
সাগর-রুনী হত্যার বিচার চাই’
সাগর-রুনীহত্যার বিচার চাই’

লেখকঃসম্পাদক,রংপুর সংবাদ।