রংপুর সংবাদ » দেশটাকে রক্ষা করবে কে?

দেশটাকে রক্ষা করবে কে?


রংপুর সংবাদ ফেব্রুয়ারী ৬, ২০২০, ৮:১০ পূর্বাহ্ন
দেশটাকে রক্ষা করবে কে?

তসলিমা নাসরিনঃ-গণতন্ত্রে কী থাকতে হয়? বাক স্বাধীনতা থাকতে হয়। ঠিক না বেঠিক?

-ঠিক।

-বাংলাদেশে কি বাক স্বাধীনতা আছে? আছে কি নাই? চিল্লাইয়া বলেন।

-নাই।

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার অজুহাতে আজ থেকে ২৫ বছর আগে দেশের একজন নারীবাদী লেখককে বাংলাদেশ সরকার নির্বাসনে পাঠিয়েছিল। নারীবিরোধী মৌলবাদী অপশক্তিকে খুশি করার জন্য পাঠিয়েছিল। সরকার বদলেছে, মৌলবাদী অপশক্তির সংগে আপসের বদল হয়নি।

আজ অবধি সেই লেখককে দেশে ঢুকতে দেওয়া হয় না। আজও ফতোয়াবাজ ধর্মব্যবসায়ীদের, আজও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী মানবাধিকারবিরোধীদের তুষ্ট করে চলতে হয় দেশের সরকারকে। দেশের সরকার মনে হচ্ছে এই অপশক্তির হাতে জিম্মি।

কয়েক বছর যাবৎ দেশের বুদ্ধিদীপ্ত মুক্তচিন্তকদের এক এক করে কুপিয়ে মেরেছে জঙ্গিবাদীরা। এই সন্ত্রাসীদের আজও বিচার হয়নি। যে কেউ যে কোনও কিছুতেই যে কারও বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে বলে চেঁচিয়ে উঠছে। পচা পুরোনো একটা আইন দেখিয়ে মুক্তবুদ্ধির শিক্ষিত সচেতন নিরপরাধ মানুষকে ফাঁসাচ্ছে সরকার। জেলে ভরছে। ভিন্নমত যাঁদেরই ছিল, যাঁরাই সমাজের সংস্কার চেয়েছেন, ধর্মনিরপেক্ষতার দাবি করেছেন, ভয়ে দেশ থেকে পালিয়েছেন।

কারা তাহলে দেশে বাস করবে? দেশ কাদের? একপাল চাটুকার, আর অশিক্ষিত অসভ্য ধর্ম ব্যবসায়ী, আর তাদের অসংখ্য বুদ্ধিসুদ্ধিহীন শিষ্য? সরকার কি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নয়? অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে বটে, কিন্তু নৈতিক অবনতি যে হচ্ছে? যদি শিক্ষা-সংস্কৃতিই না থাকে, যদি আধুনিকতা-সভ্যতাই না থাকে, তাহলে টাকা-পয়সা দিয়ে কী করবে মানুষ

দেশের টাকা-পয়সা সহায় সম্পদ লুঠ করে দেশপ্রেমিকরা নাকি বেশ পালাচ্ছে আজকাল। বিদেশে পাকাপাকিভাবে বাস করার সব আয়োজন সারা। ইউরোপ আমেরিকার প্রাসাদে এক একজন সুখে শান্তিতে বাস করবে। ধর্ম কর্মও করবে নিশ্চয়ই। পাপ মোচনের জন্য তো হজে যাবেই।

সুফি সংগীত, পালাগান, বাউল ভাটিয়ালি মুর্শেদি গাওয়ার লোকেরাই বোধহয় বাকি ছিল। এদের গর্দান নেওয়ার জন্য তৈরি ধর্মের তলোয়ার। নিরীহ গোবেচারা শরিয়ত বয়াতিকে জেলে ঢোকানো হয়েছে। রিতা দেওয়ান নামে এক সুফি বাউলের ওপর আক্রমণ চলছে। তিনি তাঁর মতো করে গান গেয়েছেন, গান গাওয়ার আগে তাঁর মতো করে আধ্যাত্মিক বয়ান দিয়েছেন। তাঁর আধ্যাত্মিক বয়ান ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের পছন্দ হয়নি, তাই তারা সন্ত্রাস সৃষ্টি করছে। রিতা দেওয়ান এই বর্বরদের হাত থেকে বাঁচার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন, ভয়ে তটস্থ তাঁর দুটি মেয়েও হাত জোড় করে ক্ষমা চেয়েছে। কী নিদারুণ সেই দৃশ্য। একজন শিল্পীকে ক্ষমা চাইতে হয় তাঁর শিল্পের জন্য। তাঁর অসহায়তা আর নিরাপত্তাহীনতা আমি হাড়ে মজ্জায় উপলব্ধি করেছি। চোখে জল এসেছে আমার। হ্যাঁ জল এসেছে আমার চোখে। আমার মনে হয়েছে রিতা দেওয়ান আমার দেশ। আমার  দেশকে একপাল ধর্ষক-খুনির সামনে নতজানু হয়ে হাত জোড় করতে হয়েছে, কাতর অনুনয় করতে হয়েছে যেন তাকে বাঁচতে দেয়।

বাংলাদেশকে ওরা নিজের মতো করে বাঁচতে দেয়নি। দেশের মেয়েদের যেভাবে পাক সেনারা ধর্ষণ করেছিল একাত্তরে, পাক সেনাদের এদেশি ভক্তরা দেশকে সেভাবে ধর্ষণ করছে আজ অনেক বছর।

সুফি সংগীতশিল্পী রিতা দেওয়ানের বক্তব্য আমি শুনেছি, ওয়াজিদের আস্ফালনও শুনেছি, রিতা দেওয়ানের ক্ষমা চাওয়ার দৃশ্যও আমি দেখেছি। শরিয়ত বয়াতির বক্তব্যও আমি শুনেছি। আমি বুঝে পাই না, কী কারণে এই সুফি সাধকদের গ্রেফতার করা হলো। ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস। কে কীভাবে তার ঈশ্বরকে কল্পনা করে নেবে, সেটা সম্পূর্ণই তার ব্যাপার। আমার কল্পনার সংগে তার কল্পনা না মিললে সে দোষী- এরকম যে ভাবে, তাকে নিশ্চয়ই আমরা অসহিষ্ণু বলবো। অসহিষ্ণুতে ছেয়ে গেছে গোটা দেশ।

ভিন্নমত হলেই তারা মুসলমান নয়,- এই ফতোয়া দিচ্ছে ধর্ম ব্যবসায়ীরা। সমকামীদের হত্যা করো, সুফিদের খতম করো, নাস্তিকদের কতল করোÑ হুমকি দিয়েই যাচ্ছে। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের বিরুদ্ধে যারা এই হুমকি দেয়, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে সরকার, কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ্য করি সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

কোনও সুস্থ মস্তিষ্কের সংস্কৃতিমান মানুষ বাংলাদেশে বাস করতে চায় না। তারা সুযোগ পেলেই দেশ ছাড়ছে। যারা আজও দেশে বাস করছে, তারা বাধ্য হয়ে বাস করছে। তাদের আর কোনও উপায় নেই বলে বাস করছে। এটি দেশের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক নয় কি? যদি শিক্ষিত সভ্য বুদ্ধিমান প্রতিভাবান কেউই দেশে বাস করতে না চায়, সুযোগ পেয়েই দেশ ত্যাগ করে, দেশ তবে কাকে নিয়ে সমৃদ্ধ হবে? বাংলাদেশ একটি ভয়াবহ পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে নিশ্চয়ই।

হয় তোমাকে সরকারের চাটুকার হতে হবে, তা না হলে মরতে হবে। হয় তোমাকে ধর্মান্ধ হতে হবে, মৌলবাদী হতে হবে, তা না হলে মরতে হবে। তুমি স্বাধীনতা এবং অধিকার নিয়ে ভাবো, হয় তোমাকে মুখ বন্ধ করে থাকতে হবে, তা না হলে তোমাকে মরতে হবে। বাংলাদেশে মুখ বন্ধ করে থাকা, পালিয়ে যাওয়া, জেলে যাওয়া, নির্বাসনে যাওয়া, মরে যাওয়া গোষ্ঠীটির নাম সভ্যতা, আর চেঁচানো দাপিয়ে বেড়ানো ক্ষমতাবান গোষ্ঠীটির নাম অসভ্যতা। অসভ্যতার জয়জয়কার এখন। সরকারের কাছে সুস্থ চিন্তার চেতনার মানুষের আবেদন, বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতি লোকগীতি পালাগান কবিগান বাউল ভাটিয়ালি ভাওয়াইয়া আধ্যাত্মিক গানকে বেঁচে থাকতে দিন, প্রগতিশীল প্রতিভাবান সংস্কৃতিমানদের বেঁচে থাকতে দিন। বাংলার হাজার বছরের সংস্কৃতিকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করে বিজাতীয় ওয়াজ সংস্কৃতিকে জনপ্রিয় করা হচ্ছে। এটিকে প্রশ্রয় দেওয়া মানে মোল্লাতন্ত্রকে প্রশ্রয় দেওয়া। এরাই দিন দিন বিকট আকার ধারণ করছে। এরাই গণতন্ত্রের কবর খুঁড়ে বসে আছে, এরাই একে কবর দেবে। নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এরাই দেশজুড়ে তান্ডব করবে। কয়েক যুগ এদের সঙ্গে সরকারের আপস, কয়েক যুগ বুদ্ধিজীবীদের মুখ বুজে থাকা অথবা স্বার্থান্বেষী চাটুকারে রূপান্তরিত হওয়া- দেশকে অন্ধকারে ডুবিয়ে দিয়েছে। এই অন্ধকার থেকে আলোয় আসা এখন খুব কঠিন কাজ। এই কঠিন কাজটি কার দ্বারা সম্ভব অনেকের মতো আমারও জানা নেই।

আজ শরিয়ত বাউলকে জেল থেকে মুক্ত করার এবং নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। আজ রিতা দেওয়ানকে নিরাপত্তা দেওয়ার এবং মুক্ত কণ্ঠে তাঁকে পালাগান গাওয়ার পরিবেশ দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। বাংলার বাউলরা যেন মন খুলে গান গাইতে ভয় না পান। যারা ভয় দেখায়, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্বও সরকারকে নিতে হবে।

বাক স্বাধীনতার এবং মত প্রকাশের অধিকারের বিরুদ্ধে দেশে যত আইন আছে, সবগুলোকে বাতিল করলে ইসলাম নিয়ে এদের রাজনীতি বন্ধ হবে। ইসলাম একটি ধর্ম। কিন্তু এই ধর্মকে কুচক্রিরা রাজনীতি হিসেবে ব্যবহার করছে। ধর্মের রাজনীতি কেন গণতন্ত্রের রাজনীতিকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিচ্ছে। কেন পিছিয়ে যাচ্ছে গণতন্ত্রের রাজনীতি। গণতন্ত্র শক্তপোক্ত হলে কিন্তু ধর্মকে ধর্ম হিসেবে ব্যবহার না করে রাজনীতি হিসেবে ব্যবহার করা যেত না। যার যার ধর্ম তার তার কাছে। ধর্ম যেভাবে যে মানতে চায়, সে সেভাবে মানবে। কিন্তু যখন কে কীভাবে মানবে, তা বলে দেওয়া হয়, যখন হুমকি ধমকি দেওয়া হয়, যখন ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বাধীনতা বলে কিছু থাকে না, যখন আইন প্রয়োগ করা হয়, ধর্ম এভাবে না মেনে ওভাবে মানলে জেল ফাঁসি হবে, তখন ওটি আর ধর্ম নয়, ওটি তখন রাজনীতি। ধর্মীয় অনুভূতি বলে যখন এক অদ্ভুত অনুভূতিকে আবিষ্কার করা হয়, এবং ঘোষণা দেওয়া হয় যে এটিকে আঘাত করা চলবে না, এমন কী দেশে আইন তৈরি করা হয় এটিকে স্পর্শ করলে বা আঘাত করলে জেল জরিমানা হবে- তখন সেটি ধর্ম নয়, সেটি রাজনীতি। সুস্থ রাজনীতিকরা, যারা সত্যিকার দেশপ্রেমিক, তারা ধর্মকে রাজনীতিতে নামতে বাধা দেন। ধর্মকে ধর্মের জায়গায় রাখেন- কেউ বিশ্বাস করলে করবে, না করলে না করবে, যার যেভাবে ধর্ম মানতে ইচ্ছে করে- অন্যের কোনও ক্ষতি না করে, অন্যকে বিরক্ত না করে, অন্যের স্বাধীনতা নষ্ট না করে- মানবে। যে শাসকরা এই জরুরি কাজটি দেশের স্বার্থে করতে ব্যর্থ হন, তাঁরা মূলত ব্যর্থ। অশিক্ষিত অসভ্য বর্বর দেশও অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হতে পারে, আমরা কিন্তু ওই দেশগুলোকে সভ্য দেশ বলি না। ওই দেশগুলো নিশ্চয়ই আমাদের মডেল নয়। আমরা তবে কোনদিকে এগোচ্ছি?

 লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।