1. rkarimlalmonirhat@gmail.com : Rezaul Karim Manik : Rezaul Karim Manik
  2. maniklalrangpur@gmail.com : রংপুর সংবাদ : রংপুর সংবাদ
মন্তব্য প্রতিবেদন- সাংবাদিক নির্যাতনের শেষ কোথায় ? - রংপুর সংবাদ
রবিবার, ২৬ মে ২০২৪, ০৪:৪৫ পূর্বাহ্ন

মন্তব্য প্রতিবেদন— সাংবাদিক নির্যাতনের শেষ কোথায় ?

ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় : মঙ্গলবার, ২৬ মার্চ, ২০২৪
  • ৩৯৮ জন নিউজটি পড়েছেন

রেজাউল করিম মানিক ॥
শতাধিকবার পিছিয়েছে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ, সারাদেশে প্রতিদিনই নির্যাতনের শিকার হচ্ছে সাংবাদিকরা । সরকারের কড়া বার্তা ও কঠোর অনুশাসনের পরও সরকারের ভীতরে লুকিয়ে থাকা দুষ্ট প্রকৃতির লোকগুলো দেশে বিদেশে সরকারের ভাবমুর্তি নষ্ট করার জন্যই গণমাধ্যম কর্মীদের উপর একের পর এক নির্যাতন ও হামলা চালাচ্ছে । সর্বশেষ উত্তরের জেলা লালমনিরহাটে সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে যা ঘটেছে তা এই অঞ্চলেই শুধু নয় বর্হিবিশ্বের সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে পীড়া দিয়েছে ।
লালমনিরহাট সদর উপজেলা ভূমি অফিসে পাঁচ সাংবাদিককে তালা মেরে আটকে রেখে মামলার হুমকি দিয়ে জেলে পাঠানোর চেষ্টার অভিযোগে অবশেষে বদলি করা হয়েছে সেই এসিল্যান্ড আব্দুল্লাহ আল নোমান সরকারকে। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাঁকে তাঁর পদ থেকে অবমুক্ত করে রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয় বলে জানা গেছে।
এর আগে গত ১৪ মার্চ বৃহস্পতিবার দুপুরে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় স্থানীয় পাঁচ সাংবাদিককে ওই ভূমি অফিসে অবরুদ্ধ করে মামলা দেয়ার চেষ্টা করেন সেই আলোচিত এসিল্যান্ড। সাংবাদিকদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে আব্দুল্লাহ আল নোমান সরকারকে ওই দিনই সন্ধ্যায় ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলায় বদলি করে রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়। কিন্তু আদেশের সাত দিনেও বদলি কার্যকর না হওয়ায় নানা আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। অবশেষে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আব্দুল্লাহ আল নোমান সরকারের বদলি কার্যকর হয়।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা জানান, গত ১৪ মার্চ জনদুর্ভোগের চিত্র দেখতে মাইটিভি ও ডেইলি অবজারভারের লালমনিরহাট প্রতিনিধি মাহফুজ সাজু ওই ভূমি অফিসে যান। সেখানে লালমনিরহাট সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক প্রফেসর গোলাম মোস্তফাকে অফিসের বারান্দায় জানালা দিয়ে অফিস সহকারীর কক্ষে থাকা এক ব্যক্তির সাথে তর্কবিতর্ক করতে দেখেন। প্রফেসর গোলাম মোস্তফা তাঁকে জানান, জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে ঘুরছেন। বিষয়টি নিয়ে এসিল্যান্ড তাঁর সাথে দুর্ব্যবহার করেছেন। অফিস সহকারীর কক্ষ থেকে তাঁকে বের হতে দিচ্ছিলেন না এসিল্যান্ড। পুলিশকে ফোন করতে চাচ্ছিলেন বার বার। ওই শিক্ষককে চরম অপমান করা হয়েছে বলেও উপস্থিত সাংবাদিককে জানান তিনি। এরপর সাংবাদিক মাহফুজ সাজু একাধিক সেবা গৃহীতার সাথে কথা বলেন। ভোগান্তির বিষয়ে তাদেরও বক্তব্য প্রায় একই ছিল। বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য এসিল্যান্ডের কক্ষে গিয়ে তিনি দেখেন এসিল্যান্ডের অনুপস্থিতিতে জমিজমা বিষয়ে শুনানি চলছে। সেই শুনানির কক্ষে সাংবাদিক মাহফুজ সাজু উপস্থিত থাকতে চাইলে ওই অফিসের সায়রাত সহকারী রাশিদুল ইসলাম ওরফে রাসেল সাংবাদিককে বেরিয়ে যেতে বললে সাংবাদিক মাহফুজ সাজুর সাথে তাঁর বাকবিতন্ডা হয়। এক পর্যায়ে রুমের বাইরে বেরিয়ে যাওয়া মাত্রই রাসেল মাহফুজ সাজুর হাতে থাকা মোবাইলটি কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করে। বাধ্য হয়ে মাহফুজ সাজু মোবাইল ফোনে সাংবাদিক সহকর্মীদের জানান। এর মিনিট পনের পরে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের সাংবাদিক মাজহারুল ইসলাম বিপু, এশিয়ান টিভির নিয়ন দুলাল, কালবেলার এস কে সাহেদ, প্রেসক্লাবের সদস্য সচিব লিয়াকত হোসেন সহ একে একে আটজন সাংবাদকর্মী সেখানে আসে। এর কিছুক্ষণ পর এসিল্যান্ড অফিসে আসে। তার অফিসে ঢোকার মুহূর্তটা দুজন সংবাদকর্মী ভিডিও করতে থাকেন। এটা দেখে তৎক্ষনাৎ এসিল্যান্ড ক্ষিপ্ত হয়ে সাংবাদিক মাহফুজ সাজুর দিকে তেড়ে আসেন। এক পর্যায়ে তিনি সাংবাদিক মাহফুজ সাজুর মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। মোবাইল কেড়ে নিতে ব্যর্থ হলে তিনি তৎক্ষনাৎ কলাপসিবল গেটে তালা মারার নির্দেশ দেন। এসময় এসিল্যান্ড আব্দুল্লাহ আল নোমান সরকার সাংবাদিক নিয়ন দুলালকে ধাক্কা দিয়ে গেটের ভেতরে ঢোকান এবং অফিসের কর্মচারীরা এসিল্যান্ডের নির্দেশে গেট বন্ধ করে তালা দেয়। সাংবাদিকরা এ ঘটনার প্রতিবাদ করলে তিনি সাংবাদিকদের দালাল বলে গালাগাল করেন এবং ফোনে অজ্ঞাত ব্যক্তিকে বলতে থাকেন, “স্যার আমি এনাদের বিরুদ্ধে মামলা দেব।” এরপর এসিল্যান্ড তার রুমে গিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের প্রস্তুতি নেন। এরই মধ্যে সংবাদকর্মীরা জেলা প্রশাসককে বিষয়টি জানালে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) টিএম মমিন ঘটনাস্থলে আসেন। তিনি এসে তালা খুলে সাংবাদিকদের মুক্ত করেন। তিনি প্রবেশ করা মাত্রই এসিল্যান্ড সাংবাদিকদের আবারও ‘দালাল’ বললে উপস্থিত সাংবাদিকরা এর প্রতিবাদ জানিয়ে কথাটি প্রত্যাহারের দাবী করেন। পরে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক টিএম মমিনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি টিএম মমিন সুষ্ঠ তদন্ত করে দেখবেন বলে আশ্বস্ত করলে সকল সাংবাদিক প্রেসক্লাবের দিকে রওনা হয়। কিন্তু পেছনে থাকা চ্যানেল আইয়ের ক্যামেরা পার্সন আব্দুল মান্নানের মটর সাইকেল আটক করে এসিল্যান্ড তার গাড়ির রেজিস্ট্রেশন, ড্রাইভিং লাইসেন্স চান। মান্নান বিশ মিনিট সময় চাইলে তিনি সময় না নিয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা দেন। বিষয়টি সাংবাদিকরা জেনে গেলে তাঁরা আবার প্রেসক্লাব থেকে এসিল্যান্ড অফিসে আসেন। এসে এসিল্যান্ড আব্দুল্লাহ আল নোমানের সাথে বাগবিতণ্ডায় জড়ান এই বলে যে, আপনি তো এই মামলাটা করলেন সাংবাদিকদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে। আপনি তো নিয়মিত ভাবে মোবাইল কোর্ট করছিলেন না, আপনি তো এই গাড়িটা ছাড়া আর কোন মামলা করলেন না। এমন কি আপনার অফিসের কর্মচারীর ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই তাদেরও তো করলেন না। এরপর এসিল্যান্ড ওই সংবাদকর্মীর ৫০০০ টাকা জরিমানা অনাদায় যে ছয় মাসের জেল দেন এবং এসিল্যান্ড নিজে ওই সংবাদকর্মীর হাত ধরে পুলিশের ভ্যানে উঠাতে থাকেন। উপস্থিত সাংবাদিকদের জরিমানার টাকা দেয়ার সময়টুকু দিচ্ছিলেন না। পরে উপস্থিত সাংবাদিকরা জরিমানার টাকা দিয়ে সহকর্মীকে জেল থেকে বাঁচান। ঘটনার প্রতিবাদে সাংবাদিকরা জেলা শহরের মিশন মোড়ে বসে অবস্থান নেন। খবর পেয়ে সাংবাদিকদের কাছে এসে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ উল্যাহ বিষয়টি দেখার আশ্বাস দিলে সাংবাদিকরা ফিরে যায়। পরে ওই দিনই রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে এসিল্যান্ড আব্দুল্লাহ আল নোমান সরকারকে বদলি করার লিখিত আদেশ আসে।
ঘটনাটি বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এ নিয়ে একাধিক সংবাদপত্র সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কর্মরত বাংলাদেশী সাংবাদিকদের সংগঠন বিজেআইএম এবং সারা পৃথিবীতে নির্যাতিত সাংবাদিকদের রক্ষা করা একটা সংগঠন সিপিজে আলাদা বিবৃতি দেয়।
এদিকে সাংবাদিক হেনস্তার ঘটনায় গত ১৪ মার্চ আব্দুল্লাহ আল নোমান সরকারকে ঠাকুরগাও জেলার হরিপুর উপজেলায় বদলি করা হলেও বদলির আদেশ কার্যকর না হওয়ায় সাংবাদিকদের মাঝে অসন্তোষ দেখা দেয়। গত সোমবার (১৮ মার্চ) বিকেলে লালমনিরহাট প্রেসক্লাবের সাংবাদিকরা উদ্বেগের বিষয়টি লিখিতভাবে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসককে অবহিত করেন।
সাংবাদিকরা জানান, সহকারী কমিশনারের বদলির আদেশকে কেন্দ্র করে এসিল্যান্ডের অনুগত কিছু তরুণ তাঁর পক্ষ নিয়ে ফেসবুকে সাংবাদিকদের সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে। সাংবাদিক ও প্রশাসনকে মুখোমুখি অবস্থানে নেওয়ার চেষ্টা করে এই পক্ষ।
সাংবাদিক মাহফুজ সাজু বলেন, এসিল্যান্ড আব্দুল্লাহ আল নোমান বদলি ঠেকাতে নানা অপতৎপরতা চালিয়েছে। টাকা দিয়ে কিছু লোক ভাড়া করে এনে বদলি ঠেকাতে চেয়েছিল শেষ পর্যন্ত তা পারেনি। আব্দুল্লাহ আল নোমানের মত কর্মকর্তার জন্য সরকার বিতর্কিত হন, বিবৃত বোধ করেন। সাংবাদিকরা জনদুর্ভোগের কথা সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরতে গিয়ে তাদের মত কর্মকর্তার রোষানলে পড়েন।
লালমনিরহাট প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন স্বপন বলেন, সাংবাদিক ও প্রশাসনের মধ্যে বিরোধ তৈরি করে একটি পক্ষ অস্থির অবস্থা সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। বদলির আদেশ দ্রুত কার্যকর না হওয়ায় একটি পক্ষ সুযোগ নিয়েছে।
এ ব্যাপারে আব্দুল্লাহ আল নোমান এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের সাথে কোন কথা বলতে রাজি হননি।
লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ উল্ল্যাহ সাংবাদিকদের জানান, কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) লালমনিরহাট সদর উপজেলায় যোগদান করতে কিছুটা সময় নিয়েছেন তাই দেরি হয়েছিল, পরে রাজারহাট উপজেলার এসিল্যান্ডকে লালমনিরহাট সদরে বদলির আদেশ নতুন করে আসলে আব্দুল্লাহ আল নোমানকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে।
এদিকে এ ঘটনায় ওই এসিল্যান্ড সরকারি কাজে বাধাঁর অভিযোগ এনে লালমনিরহাট সদর থানায় ভুক্তভোগি ৬ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাধারন ডায়েরি(জিডি) করে গেছেন বলে জানা গেছে ।

আপনার সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার দিন

Leave a Reply

এই ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ

© ২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | রংপুর সংবাদ.কম
Theme Customization By NewsSun