রংপুর সংবাদ » ঢাকার দুই সিটিতে নির্বাচন ভোটের বাতাস গরম বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ, উত্তেজনা, উদ্বেগ

ঢাকার দুই সিটিতে নির্বাচন ভোটের বাতাস গরম বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ, উত্তেজনা, উদ্বেগ


রংপুর সংবাদ জানুয়ারী ১৩, ২০২০, ৬:১১ অপরাহ্ন
ঢাকার দুই সিটিতে নির্বাচন ভোটের বাতাস গরম বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ, উত্তেজনা, উদ্বেগ

রংপুর সংবাদ ডেস্কঃউৎসবমুখর পরিবেশেই শুক্রবার শুরু হয়েছিল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচার।

শুরুতেই সব হেভিওয়েট প্রার্থী শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করায় সাধারণ মানুষও আশ্বস্ত হন। কিন্তু এক দিন না যেতেই শনিবার রাত থেকে গতকাল রোববার পর্যন্ত বেশ কিছু বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ এবং প্রচারে বাধা সৃষ্টির ঘটনা ঘটেছে।

এ নিয়ে প্রার্থীরা অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগও করছেন। এ পরিস্থিতিতে নির্বাচন নিয়ে মানুষের মনে পুরোনো শঙ্কাগুলোই আবার যেন উঁকি দিতে শুরু করেছে। তীব্র শীতে একদিকে যখন ক্রমে নামছে তাপমাত্রা, অন্যদিকে নির্বাচনী প্রচারে তখন দৃশ্যতই বাড়তে শুরু করেছে উত্তেজনার পারদ।

এ পরিস্থিতি শুরুতেই যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সংশ্নিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

ভোটের প্রচারে বিভিন্ন হামলার ঘটনায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ক্ষমতাসীন দলকে দায়ী করে বলেন, জয় বাংলা ¯েøাগান দিয়ে হামলা হচ্ছে। কাজেই হামলা কারা করছে, সেটা পরিস্কার। তিনি বলেন, এমনিতেই এ সরকারের আমলে জাতীয় নির্বাচন হয়েছে রাতের আঁধারে। তারপরও বিএনপি ঢাকার সিটি নির্বাচনে অংশ নিয়েছে।

কিন্তু এখন থেকেই সরকারি দলের এই সহিংস আচরণ খুবই দুঃখজনক। জনগণ সবকিছু দেখছে। আওয়ামী লীগ সুষ্ঠু নির্বাচন চায় না, কারণ তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামÐলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ সমকালকে বলেন, বিএনপির স্বভাবই হয়েছে শুধু নালিশ করা। তারা জানে, তাদের জনসমর্থন নেই; জনগণ তাদের ওপর আস্থা রাখে না। এ কারণে তারা এ নালিশ-সে নালিশ করে যাচ্ছে। তারা নালিশ করতে থাকুক, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মাঠে থেকে নির্বাচনী কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই ছোটখাটো সহিংসতা, সংঘর্ষ বন্ধে নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা না নিলে তা মানুষের মনে আস্থার সংকট বাড়বে। এখনই নির্বাচন কমিশনকে কার্যকর ভূমিকা পালনের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

যেসব স্থানে সংঘর্ষ :শনিবার সন্ধ্যায় প্রথম হামলার ঘটনা ঘটে বাংলামটরে ঢাকা উত্তর সিটিতে বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের কার্যালয়ের সামনে। এ হামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম আহŸায়ক এইচ এম আবু জাফরসহ পাঁচজন আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তানজিল হাসান। আহত অন্যরা হলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহŸায়ক মাসুম, এস এম হলের যুগ্ম আহŸায়ক মাসুম বিল্লাহ, মুহসীন হলের যুগ্ম আহŸায়ক হাসান ও ঢাকা কলেজের যুগ্ম সম্পাদক মাসুদ রানা।

আহতদের চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। হামলার বিবরণ দিয়ে তানজিল বলেন, নিয়মিত প্রচারকাজ শেষ করে তারা অফিস থেকে বের হয়েছিলেন। অফিসের নিচে নামতেই ২০/২৫ জন রড ও হকিস্টিক নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়।

শনিবার সন্ধ্যায় হামলা হয়েছে গোপীবাগে ঢাকা দক্ষিণ সিটির বিএনপি প্রার্থী প্রকৌশলী ইশরাক হোসেনের গাড়িবহরেও। অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা হামলা চালিয়ে একটি গাড়ির সামনের গ্লাস ভেঙে ফেলে। কারা এ হামলা করেছে, সে বিষয়ে গতকাল পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারেননি ইশরাকের কর্মীরা।

তৃতীয় হামলার ঘটনা ঘটে গতকাল সকালে মিরপুরে। সকাল ১১টায় মিরপুর ১ নম্বর মাজার রোড এলাকায় প্রচার চলাকালে এ হামলা হয় বলে জানিয়েছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল। তিনি জানান, প্রচার মিছিলে জয় বাংলা ¯েøাগান দিয়ে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এ সময় একজন আহত হন। হামলাকারীরা তার এবং কর্মী-সমর্থকদের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে।

ঢাকা মহানগর বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, গতকাল দুপুরে ওয়ারীর বলধা গার্ডেন এলাকায় পোস্টার লাগানোর সময় বিএনপির চার কর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এদিকে, নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের ফটকে গতকাল ঢাকা দক্ষিণে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীর প্রতীক নৌকার পোস্টার লাগানো নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপি নেতাকর্মীরা জানান, মেয়র প্রার্থীর এবং ওই এলাকার কাউন্সিলর এনামুল হকের পোস্টার লাগানো হয় বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের মূল ফটকে। এতে উপস্থিত বিএনপির নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হন।

বিষয়টি নিয়ে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে ওই এলাকায়। ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতারা আরও জানান, ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের ৩ নম্বর জাগিনগর রোডে বিএনপির মহিলা প্রার্থী মেহেরুন্নেছার নির্বাচনী ক্যাম্পে হামলা হয়েছে গতকাল দুপুরে। এতে শ্রমিক দলের ওয়ার্ড সাধারণ সম্পাদক আবদুস সালাম আহত হয়েছেন।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ওপর হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত শনিবার ডিএসসিসির ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগের সমর্থনে এবারও প্রার্থী হওয়া আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী জহিরুল ইসলাম ভুঁইয়া ভুট্টু। তিনি বলেন, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শান্তিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে গেলে কয়েকজন যুবক তাকে বলেন, কাউন্সিলর আনিস সাহেব ডেকেছেন। আনিসুর রহমানের নির্বাচনী কার্যালয়ের সামনে গেলেই কালা মাহবুব ও পিচ্চি রুবেলের নেতৃত্বে কয়েকজন সন্ত্রাসী তার ওপর হামলা করে।

তারা বলতে থাকে, প্রার্থিতা প্রত্যাহার কবে করবেন। এ সময় জহিরুল ইসলাম ভুঁইয়ার ছেলে বাধা দিতে গেলে তাকে মারধর করা হয়। আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি জানান, এ ব্যাপারে শনিবারই রিটার্নিং অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। থানায় মামলাও করবেন।

এ ব্যাপারে কাউন্সিলর আনিসুর রহমান সমকালকে বলেন, গতকাল যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ গিয়েছিলেন তার নির্বাচনী প্রচারে। তার বিপুলসংখ্যক কর্মী-শুভাকাঙ্ক্ষী এতে অংশ নেন। কিন্তু হঠাৎ করেই জহিরুল ইসলাম সেখানে ঢুকে নিজের জন্য ভোট চাইতে শুরু করেন। এ জন্য তার লোকজন তাকে সেই মিছিল থেকে ধরে বের করে দেন। এর বাইরে কোনো ঘটনা ঘটেনি।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ :সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এখন পর্যন্ত যেসব ঘটনা, সেগুলো ছোটখাটো। বড় নির্বাচনে এ ধরনের ঘটনা কিছু ঘটে। এসব ঘটনা যেন বড় না হয়, সে জন্য কার্যকর ভূমিকা নির্বাচন কমিশনকেই নিতে হবে। যারা হামলার জন্য দায়ী, তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ গেলে সে ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। ছোটখাটো ঘটনা থেকে বড় ঘটনা ঘটলে সেটা নির্বাচনী পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। অতএব, এখনই নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক হতে হবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এমনিতেই গত জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে আস্থার সংকট আছে। এখন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে যদি প্রচার-প্রচারণার একেবারে শুরুতেই সংঘর্ষ-সহিংসতা শুরু হয়ে যায়, তাহলে সেই আস্থার সংকট আরও ঘনীভূত হবে। এসব সংঘর্ষের ঘটনা শুধু যে সার্বিক নির্বাচনী পরিবেশকে বিঘিœত করবে তা নয়, আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রেও বিরূপ প্রভাব ফেলবে। আইন অনুযায়ী এখন ঢাকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাচন কমিশনের অধীন। অতএব, এখনই কমিশনকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। যারা নির্বাচন কমিশনে আছেন, তারা যদি নিজেদের সাংবিধানিক দায়িত্বের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাশীল হন, তাহলে এসব হামলার সঙ্গে দল-মত নির্বিশেষে যারাই জড়িত থাক, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেবেন।

সবার প্রত্যাশাও এটাই। জাতি নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রধান পূর্বশর্ত।