রংপুর সংবাদ » তিস্তা এখন আবাদি জমি!

তিস্তা এখন আবাদি জমি!


রংপুর সংবাদ জানুয়ারী ৮, ২০২০, ১২:৫২ পূর্বাহ্ন
তিস্তা এখন আবাদি জমি!

মাহির খানঃ, নতুন বছরের শুরুতেই তিস্তা পানি শুন্য। খরতা তিস্তা দাড়িয়ে আছে মরুভূমির উপর। গত বছরের কয়েক দফা বন্যার পর তিস্তার বুকে জেগে উঠেছে ধুধু বালু চর।

তিস্তা নদী খনন, শাসন, ড্রেজিং ও সংরক্ষণ না করায় উজান থেকে নেমে আসা পলি জমে অগভীর খরস্রোতী রাক্ষুসি তিস্তা নদী আবাদি জমিতে রূপ নিয়েছে।

এই বালু চলে তিস্তাপাড়ে লাখো কৃষক বিভিন্ন ফসল ফলিয়ে স্বপ্ন দেখছে।
দীর্ঘদিনের তিস্তার ভাঙনে জমি খুঁয়ে যাওয়া পরিবার গুলো যেন তাদের প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

তিস্তায় শেষ সম্বল হারিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলে যাওয়া পরিবার গুলো পুনরায় চরে ফিরে এসে বাপ-দাদার ভিটায় পরিজন নিয়ে নানাবিধ ফসলের চাষাবাদে মেতে উঠেছে।

লালমনিরহাটের জেগে উঠেছে ৬৩ চর। বালুচরে দিগন্তজুড়ে সবুজের মাঠে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন কৃষক। আলু,ভুট্টা,মরিচ,মুশুর ডাল,মিষ্টি কুমরা,চিনা বাদাম, পিয়াজ,রশুন, তরমুজ,তামাকসহ বিভিন্ন ফসল ফলার ধুম পড়েছে তিস্তায়।

তিস্তার দুই পাড়ে বসবাসকারীরা জানান, তিস্তা এখন আর নদী নয়, এ যেন বিস্তীর্ণ আবাদি জমি। তিস্তার বুকে খেয়াপারে বা মাছ ধরতে নৌকা নিয়ে ছুটে চলা মাঝিমল্লাদের দৌড়ঝাঁপ নেই। পানি আর মাছে পরিপূর্ণ তিস্তার বুকে জেগে উঠেছে শুধুই বালুচর।

মাছ ধরতে না পেরে মানবেতর জীবন যাপন করছে নদীর দুই পাড়ের কয়েক হাজার জেলে পরিবার।
বিপন্ন হতে বসেছে তিস্তার বুকে বাস করা নানা জীববৈচিত্র্য। নৌকা নয়, পায়ে হেঁটেই,মহিষের গাড়িতে,আবার কখনও মটর সাইকেলে তিস্তা পাড়ি দিচ্ছেন নদী দুই পাড়ের মানুষজন। জেলে থেকে শুরু করে নদীকে কেন্দ্র করে বেঁচে থাকা লাখো মানুষের কান্নায় তিস্তাপাড়ের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, এ অঞ্চলের বৃহৎ নদী তিস্তা এখন মরুভুমি। এর বুকে ফলছে নানা ধরনের ফসল। কথা হয় হাতীবান্ধা উপজেলার সানিয়াজান ইউনিয়নের তিস্তা পাড়ের পাসশেখ সুন্দর গ্রামের হাশেস আলীর সাথে তিনি রংপুর সংবাদকে বলেন, গতবছরে দুই বিঘা আবাদী জমি তিস্তায় বিলিন হয়ে গেছে।

বর্তমানে নদীর পানি না থাকায় জেগে উঠা চরে শেষ সম্বল দুই বিঘা জমিতে আবাদ শুরু করি। জমিতে ভুট্টা, মুশুর ডাল, মিষ্টি কুমড়া, লাগিয়েছি। আশা করি ভাল ফসল পাব। চরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ফিরে দেখা গেছে বাহারি ফসলের নজর কারা দৃশ্য।

লালমনিরহাটের চর রাজপুর এলাকার আকবার হোসেন রংপুর সংবাদকে জানান, তিস্তায় একহাঁটু পানিও নেই হেঁটে নদী পার হওয়া যায়। এতি বছর এই সময়ে তিস্তায় পানি থাকে না। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জমিতে ফসল ফলাই।

প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে নেমে আসে বালু। ফলে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বছর বছর তলদেশ ভরাট হওয়ায় এ জেলার নদীগুলো হারাতে বসেছে তার ঐতিহ্য। নদীতে মাছ ধরে যারা জীবিকা নির্বাহ করতেন, তারা আজ অসহায়। পানি না থাকায় জেলেরা পেশা বদল করে চলে যাচ্ছেন অন্য পেশায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের এক পরিসংখ্যান মতে, লালমনিরহাট জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ছোট-বড় অনেকগুলো নদী। কিন্তু কালক্রমে নদী ভরাট হয়ে পানি শুকিয়ে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে এ জেলার জনপদ। বন্ধ হয়ে গেছে নদীকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য, চাষাবাদ। আর পানি না থাকায় দুর্দিন চলছে মৎস্যজীবীদের। তিস্তা, ধরলা, রতনাই, স্বর্ণামতী, সানিয়াজান, সাঁকোয়া, মালদহ, ত্রিমোহিনী, সতী, গিরিধারী, ছিনাকাটা, ধলাই, ভেটেশ্বরসহ ছোট-বড় ১৩টি নদী লালমনিরহাট জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, যার দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে চার শ কিলোমিটার।

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, নদীগুলো পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ১৩টি নদী ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে এগুলোতে কোনো পানি নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওই সূত্রটি দাবি করে, নদীগুলো খনন করে পানিপ্রবাহ ধরে রাখা সম্ভব।

এ ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছা প্রয়োজন বলে মনে করেন পাউবোর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। এদিকে ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পর নীলফামারী জেলার কালীগঞ্জ সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে ঐতিহাসিক তিস্তা নদী।

লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী বন্দর হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিশেছে তিস্তা। নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩১৫ কিলোমিটার হলেও বাংলাদেশ অংশে রয়েছে ১৬৫ কিলোমিটার।

দেশের অন্যতম সেচ প্রকল্প লালমনিরহাটের হাতীবান্ধার তিস্তা ব্যারাজ অকার্যকর হওয়ার উপক্রম। তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত রেলসেতু, সড়কসেতু ও নির্মাণাধীন দ্বিতীয় তিস্তা সড়কসেতু দাঁড়িয়ে আছে ধু-ধু বালুচর তিস্তার ওপর। পায়ে হেঁটেই পার হচ্ছে অনেকে। ঢেউহীন তিস্তায় রয়েছে শুধুই বালুকণা।

তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্প সূত্র জানায়, বর্তমানে তিস্তায় পানি রয়েছে সাড়ে ৩ হাজার কিউসেক। প্রকল্প এলাকায় সেচ দেওয়া এবং নদীর প্রবাহ ঠিক রাখতে তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে প্রয়োজন ২০ হাজার কিউসেক পানি।

শুধু সেচ প্রকল্প চালাতেই প্রবাহমাত্রা থাকা প্রয়োজন ১৪ হাজার কিউসেক এবং নদীর অস্তিত্ব রক্ষার জন্য চার হাজার কিউসেক পানি। কিন্তু তিস্তায় প্রয়োজনীয় পানি মিলছে না। শুষ্ক মৌসুমে বোরো আবাদের সময় ব্যারাজ পয়েন্টে কয়েক বছর ধরে পাওয়া যায় মাত্র ৫০০ কিউসেক পানি।

ব্যারাজের সবকটি জলকপাট বন্ধ রেখে সেচ প্রকল্পে পানি সরবরাহ করায় নদীর ভাটিতে আর প্রবাহ থাকছে না।
নীলফামারী জেলার ডালিয়া ও লালমনিরহাট জেলার দোয়ানীতে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে তিস্তা সেচ প্রকল্প চালু হয় ১৯৯৮ সালে।

নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুর জেলার ১২টি উপজেলার ৯১ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দিতে পারার কথা এই প্রকল্পে। কিন্তু এটা শুরুই হয় ৭৯ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দিয়ে। এরপর ক্রমাগত সেচের আওতা কমেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ডিভিশনের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান রংপুর সংবাদকে বলেন,তিস্তার পানি প্রবাহ ধরে রাখার চেষ্টা করছি। উজান থেকে পানি কম আসায় এবার সেচযোগ্য জমির আওতা কমানো হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ডিভিশনের কৃষি স¤প্রসারণ কর্মকর্তা রাফিউল বারী রংপুর সংবাদকে জানান, জানুয়ারীর শুরুতেই তিস্তার পানি খুবই কম। শুষ্ক মৌসুমে ১০ হাজার কিউসেক পানি পাওয়া গেলে প্রকল্পটি তার লক্ষ্য পূরণ করতে পারত।

লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার আরাজি শেখ সিন্দুর গ্রামে মোতালেব হোসেন রংপুর সংবাদকে বলেন, তিস্তার চরে ১০ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করছি পানির অভাবে ভুট্টার গাছ মরতে বসেছে। এখন নিরুপায় হয়ে শ্যালো মেশিন দিয়ে সেচ দিতে হচ্ছে।

প্রায় ২০ বছর ধরে তিস্তা নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন লালমনিরহাট জেলার গড্ডিমারী ইউনিয়নের দোয়ানী গ্রামের আকবর আলী (৫০)।

তিনি বললেন, ‘এখন নদীতে পানিও নাই, মাছও নাই। বর্ষায় অতিরিক্ত পানির কারণে নদীতে মাছ ধরা যায় না। আমরা খুব কষ্টে আছি।’

গড্ডিমারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো.আতিয়ার রহমান রংপুর সংবাদকে বলেন, তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি না হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে চৌচির হয়ে পড়ে তিস্তা নদী। জেগে ওঠে অসংখ্য চর। এই চরে কৃষকরা চাষবাদ শুরু করেছেন।

লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক বিদু ভূষণ রায় জানান, তিস্তার চরাঞ্চল এখন আবাদি জমিতে পরিণত হয়েছে। চরাঞ্চলের মাটিতে পলি জমে থাকার কারণে অনেক উর্বর।

সে কারণে রাসায়নিক সার ছাড়াই বিভিন্ন ফসলের ফলন ভাল হচ্ছে। বিশেষ করে চরাঞ্চলে ভুট্টা, গম, আলু, মরিচ, পিঁয়াজ, রসুন, চিনাবাদাম, তরমুজ, সরিষা, তিল, তিশিসহ শাকসবজি এবং নানা জাতের দান চাষ বেশি হচ্ছে। কৃষকরা নানাবিধ ফসল চাষাবাদ করে লাভবান হচ্ছে দিনের পর দিন।