রংপুর সংবাদ ওয়াজে করণীয়-বর্জনীয় - রংপুর সংবাদ

ওয়াজে করণীয়-বর্জনীয়


রংপুর সংবাদ ডিসেম্বর ১, ২০২২, ৩:০৪ PM
ওয়াজে করণীয়-বর্জনীয়

মুসলিম সমাজে ইসলামি শিক্ষার প্রচার-প্রসারে ওয়াজ এখনো প্রাসঙ্গিক। বিশেষত গ্রামাঞ্চলে সাধারণ মানুষ, যারা সব ধরনের শিক্ষা ও শিক্ষা উপকরণ থেকে বঞ্চিত, তাদের ধর্মীয় শিক্ষার প্রধান অবলম্বন মসজিদের সাপ্তাহিক নসিহত ও বার্ষিক ওয়াজ মাহফিল।

মানুষকে দ্বীনের পথে আহ্বান জানানো মুসলমানের ধর্মীয় দায়িত্ব। এর অন্যতম মাধ্যম ওয়াজ। আরবি ওয়াজের বাংলা অর্থ সদুপদেশ। পরিভাষায় ওয়াজ হলোজান্নাতের সুসংবাদ ও জাহান্নামের ব্যাপারে সতর্ক করার মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর পথে এমনভাবে আহ্বান করা, যাতে তাদের অন্তর বিগলিত হয়। মুমিনের জীবনে ওয়াজ-নসিহত ও ধর্মীয় উপদেশের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য এসেছে উপদেশ ও তোমাদের অন্তরে যা রয়েছে তার আরোগ্য এবং মুমিনের জন্য হেদায়েত ও রহমত।’ সুরা ইউনুস : ৫৭

 

যেহেতু ওয়াজ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই ওয়াজ-নসিহত খোদাভীরু, বিজ্ঞ আলেমদের দায়িত্ব। যার তার ওয়াজ শোনার অনুমতি ইসলামে নেই। বিখ্যাত তাবেয়ি মুহাম্মদ ইবনে সিরিন (রহ.) বলেন, এই ইলম (কোরআন-সুন্নাহর জ্ঞান) হচ্ছেদ্বীন। সুতরাং দেখে নাও, কার কাছ থেকে তোমরা তোমাদের দ্বীন গ্রহণ করছো। শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি (রহ.) বলেন, ওয়ায়েজ তথা বক্তাকে প্রাপ্তবয়স্ক, জ্ঞানসম্পন্ন, সর্বাধিক খোদাভীরু এবং ন্যায়পরায়ণ হতে হবে। কোরআন-হাদিসের জ্ঞানে পারদর্শী হওয়ার পাশাপাশি সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন, তাবে-তাবেয়িনের জীবনবৃত্তান্ত সম্পর্কে বিশদভাবে জানা। সেই সঙ্গে বক্তাকে মুহাদ্দিস হতে হবে অর্থাৎ হাদিসের বিশুদ্ধ ছয় কিতাব বোখারি, মুসলিম, তিরমিজি, আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহসহ অন্যান্য হাদিসের গ্রন্থ সম্পর্কে বিস্তর জানাশোনার পাশাপাশি সহিহ, জয়িফ, মওজু হাদিসের মধ্যে পার্থক্য করার যোগ্যতা থাকা, এসব জ্ঞান যোগ্য উস্তাদ থেকে অর্জন করা এবং কোরআনের তাফসির ও কঠিন আয়াতসমূহের সঠিক ব্যাখ্যা ইত্যাদি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান থাকা। আল কওলুল জামিল : ১৩৮-১৪০

দেওবন্দের এক ফতোয়ায় বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি আলেম নয় তার জন্য ওয়াজ করা ঠিক নয়। কেননা ওয়াজের মধ্যে অধিকাংশ সময় কোরআন মাজিদের আয়াত অথবা হাদিসের সারাংশ বয়ান করতে হয়। যারা আলেম নয় তারা কোরআন-হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা বর্ণনা করতে পারে না। সুতরাং এমন ব্যক্তির ওয়াজ দ্বারা কোরআন-হাদিসের অপব্যাখ্যার দ্বার উন্মোচিত হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।

ফতোয়ায়ে আলমগীরীতে আছে, ওয়াজের জন্য পাঁচটি শর্ত রয়েছে। এর অন্যতম হলোইলম তথা জ্ঞান। কোরআন-হাদিসের সঠিক ইলম অর্জন করে ওয়াজ করা। কেননা কোনো মূর্খ ব্যক্তি অন্যকে সঠিকভাবে দ্বীন বোঝাতে ও শেখাতে পারে না।

বক্তারা যেহেতু দ্বীন প্রচারক। এজন্য নির্ভেজাল আকিদা, সহিহ তরিকা ও একনিষ্ঠতার সঙ্গে এই কাজগুলো করতে হবে। এর পাশাপাশি বক্তাদের করণীয় ও বর্জনীয় কিছু বিষয় খুব ভালোভাবে রপ্ত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, জনপ্রিয়তা অর্জন করতে কয়েক মিনিটের একটি ভালো বক্তব্যই যথেষ্ট, তবে কাজটি কঠিন। তাই বক্তাদের শুধু ঢোলের মতো আওয়াজ দিলেই চলবে না, ভেতরে কিছু থাকতে হবে। নিবন্ধে বক্তাদের করণীয় সম্পর্কে দুটো কথা না বললেই নয়।

করণীয় : শব্দচয়ন ও বাক্য প্রয়োগে পরিশীলিত ভাষা ব্যবহার করা জরুরি। বাংলা, ইংরেজি, আরবি ও কোরআন তেলাওয়াতসহ সব শব্দ বিশুদ্ধ হওয়া চাই। এ ছাড়া স্থান, কাল, পাত্র বুঝে কথা বলা। সময়ের প্রতি সচেতন থাকা, শ্রোতাদের মন-মানসিকতার দিকে খেয়াল রাখা, দেশের প্রচলিত আইন, সংবিধান ও সম্মানীয়দের সম্মান দিয়ে কথা বলা। কোনো অবস্থাতেই ভিন্ন সম্প্রদায়, ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীসহ কাউকে আঘাত দিয়ে কথা না বলা। কোরআন-হাদিস থেকে পরিশীলিত ভাষায় দাওয়াত পেশ করা, সব ধরনের অশ্লীল অপ্রাসঙ্গিক বাক্য ও অঙ্গভঙ্গি পরিহার করা, বিরোধী পক্ষ, বিরোধী দল কিংবা গোষ্ঠীকে গালাগাল থেকে বিরত থাকা। ওয়াজে বিনয়ী হওয়া, অন্যের আবেগ-অনুভূতির প্রতি যত্নবান হওয়া, স্বকীয়তা বজায় রাখা, অন্যের বক্তব্য নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকা।

বর্জনীয় : সর্বাবস্থায় সব ধরনের লৌকিকতা পরিহার করা। লোকদেখানো কাজ না করা। ওয়াজকে পেশা হিসেবে গ্রহণ না করা। চোখ ধাঁধানো পোশাক পরে মঞ্চে না ওঠা, গান, ছন্দ, অভিনয়, পরানুকরণ এড়িয়ে চলা। মিথ্যা পরিহার করা। বেশি লোকের জমায়েত দেখে অহংকার না করা। গাড়ি, বাড়ি, টাকা-পয়সা, চেহারা, দৈহিক সৌন্দর্য ও কণ্ঠ, শিক্ষাগত যোগ্যতা ইত্যাদি নিয়ে গর্ব না করা। আল্লাহকে ভয় করার পাশাপাশি নিজেকে বিরাট কিছু ভাবা থেকে বিরত থাকা, মনের ভেতরে জনপ্রিয় হওয়ার লালসা পোষণ না করা। যেকোনো ধরনের অপ্রয়োজনীয় ছবি ও ভিডিও আপলোড থেকে বিরত থাকা। খাবারের আইটেম নিয়ে সেলফি তোলা, টুপিটা কে উপহার দিল, কীভাবে মায়ের সেবা করছেন, কোন বিমানের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন, কোন গাড়িতে ওঠে আছেন, টুপি ছাড়া নানা স্টাইলের ছবি পোস্ট থেকে বিরত থাকা।

লোভ-লালসা পরিহার করা এবং কথা ও কাজের গরমিল পরিহার করা। মাহফিলের ডেট দিয়ে তা বাতিল করা, বেশি টাকার লোভে ডেট পরিবর্তন করা। অন্যকে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায়ের ওয়াজ করে নিজেই জামাত পরিত্যাগ করা। বাবা-মায়ের জন্য কান্নাকাটি করে নিজেই বাবা-মার খোঁজখবর না নেওয়া।