রংপুর সংবাদ » পাশে আছি আমরা

পাশে আছি আমরা


রংপুর সংবাদ ডেস্ক ফেব্রুয়ারী ২, ২০২১, ৯:০০ অপরাহ্ন
পাশে আছি আমরা

করোনাভাইরাসে (কভিড-১৯) সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কায় পুরো দেশ এখন অঘোষিত লকডাউনে। এ সময় দেশের কোটি কোটি মানুষ যেখানে ঘরবন্দী সময় পার করছেন। অন্যদিকে মানুষের জন্য মাঠে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন সমাজের কিছু পেশার মানুষ। তেমনই গুরুত্বপূর্ণ পেশা চিকিৎসক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য কিংবা গণমাধ্যম কর্মীরা। এই সংকটে পেশাগত দায়িত্ব পালনে কীভাবে তারা ব্যস্ত সময় পার করছেন আর তাদের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার কথাগুলো শুনেছেন জুনায়েদ হাবীব।

প্রতিনিয়ত আমাদের কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হয়!

রোকসানা আনজুমান নিকোল, অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর – যমুনা টেলিভিশন।

দেশের সব পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অতুলনীয়। বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ যখন লকডাউনের আওতায় ঠিক তখনই সেসব পরিস্থিতির সব খবর পরিবেশন করছেন সাংবাদিকরা। করোনা ভাইরাসের প্রকোপে আমাদের দেশটিও এখন অঘোষিত লকডাউনের আওতায়। তাই বর্তমানে জনগণ ঘরবন্দী সময় পার করছে। সেসময়ে গণমাধ্যমকর্মীসহ বেশ কয়েকটি পেশার লোকজন নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এখনো মাঠে কাজ করছে। বলতে গেলে আমারটাই উল্লেখ করি। বর্তমানের এই সংকটকালে আমাদের প্রতিনিয়ত কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। যদি দায়িত্বের কথা বলতে হয় তাহলে বলব আমি যে বেসরকারি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলে কাজ করছি সেখানের একজন সহকর্মী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। তবুও সব সময় এসব ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয় দেশের স্বার্থে জনসাধারণের কথা ভেবেই। কারণ দেশের প্রতিটি মানুষ এখন ঘরবন্দী তাদের ঘরে রাখতেই সার্বক্ষণিক সংবাদ প্রচার আমাদেরকেই করতে হচ্ছে। আর এটা না হলে দেখা যাবে অনেকেই খবর জানতে রাস্তায় নেমে পড়বে। আমারও ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবার আছে, বাসায় বয়োজ্যেষ্ঠ দুজন মানুষ আছেন। কখনো কখনো অফিসে যাওয়ার সময় শাশুড়ি বলেন যে আজ কি অফিসে না গেলে হয় না। তবুও আমাদের প্রিয় মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে নিয়মিত একটি বাক্য শুনিয়ে অফিসে চলে আসতে হয়। আসলে তারাও এসব শুনতে শুনতে অভ্যস্ত। এখানে একটি কথা না বললেই নয়। যেমন একজন সাংবাদিক ফিল্ডে কাজ করে বাসায় ফিরে আসার সময় তখন তাঁর বাড়িওয়ালা ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কায় বাড়ি ছাড়তে বলছে বলে শুনেছি। যেখানে তাকে স্যালুট করার কথা সেখানে আমরা তাদের ঘৃণার চোখে দেখছি। এটাই আমাদের সিস্টেম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এখন জনসাধারণ নানামুখী বিষয়ে পুলিশের দ্বারস্থ হচ্ছেন!

ইফতে খায়রুল ইসলাম, অতি. উপ পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন), ওয়ারী বিভাগ, ডিএমপি।

জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পুলিশ দেশের সব দুর্যোগে অপরিসীম ভূমিকা রেখেছে এবং রাখছে। তাই বাংলাদেশ পুলিশের কথা আলাদা করে উল্লেখ করার কিছু নেই।

বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেশের গণ্ডিতে পৌঁছেছে যখন ঠিক তখন থেকেই পুলিশের প্রতিটি ইউনিট মাঠে সক্রিয় হয়েছে। বিশেষ করে বলতে গেলে এই পরিস্থিতিতে মানবিক ও সামাজিক সেবায় পুলিশের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলাফল হিসেবে এই সমাজের মানুষের চাওয়া, পাওয়া বেড়ে গেছে কয়েকগুণ!

এ সময়ে দেশের প্রত্যেক পুলিশ সদস্য মানবিক হৃদয় নিয়ে যেভাবে এগিয়ে আসছেন তা ভবিষ্যতে সমগ্র জাতির কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে! এই পরিস্থিতিতে যখন রাস্তায় কোনো মানুষ অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকে এবং কোনো পথচারী যখন সংক্রমণের ভয়ে এগিয়ে আসার সাহসটুকু দেখাচ্ছেন না, ঠিক তখন এগিয়ে যাচ্ছে পুলিশ! অচেনা, অজানা এ রকম অনেককেই উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিচ্ছে পুলিশ।

অন্যদিকে করোনায় আক্রান্ত হয়ে কেউ মৃত্যুবরণ করলে, তার পাশে পরিবার ও আত্মীয়- স্বজনকে যখন পাওয়া যাচ্ছে না, ঠিক তখন নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই মৃত ব্যক্তির দাফন কাফন ও জানাজার ব্যবস্থাও করছে পুলিশ।

রাস্তাঘাট জীবাণুমুক্তকরণ, জনসচেতনতা তৈরি, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টাসহ এ দুর্যোগে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ নিজ উদ্যোগে গোপনীয়তা বজায় রেখে, দেশের খেটে খাওয়া মানুষদের পাশে যেভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য পৌঁছে দিচ্ছেন তা এক কথায় নজিরবিহীন।

সবকিছু মিলিয়ে পুলিশের প্রতিটি কর্মকাণ্ড এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রশংসার কেন্দ্রবিন্দু। যদিও মানবিক ও সামাজিক দায় থেকেই আমাদের এই ভূমিকা, কোনো বাহবা পেতে নয়!

দিন শেষে যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ধনাত্মক ও প্রশংসাসূচক সাধুবাদ দেখতে পাই তখন এই পেশার একজন সদস্য হিসেবে নিজ পেশার প্রতি ভালোবাসা ও অহংবোধ আরও বেড়ে যায়! বাংলাদেশ পুলিশের প্রত্যেক পেশাদার সদস্য নিজেদের সর্বোচ্চটুকু উজাড় করে দেয়ার চেষ্টারত!

মনের ছোট্ট কোণে শুধু একটি সুরই বেজে উঠতে থাকে, পেশাগত দায়িত্ব যথাযথ পালনের ফলাফল হিসেবে আমাদের সম্মানিত নাগরিকগণের আচরণে যেন সহমর্মিতা ও সচেতনতাটুকু ফুটে উঠে।

সময়টা চিকিৎসকদের জন্য চ্যালেঞ্জের

ডা. শেখ ফয়েজ আহমেদ, সিনিয়র কনসালটেন্ট, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।

ছোটবেলায় চিকিৎসক হয়ে মানবসেবা করব এই ব্রত নিয়েই বড় হয়েছি। তাই এই পেশায় আসা। এখন বিশ্বের মহা দুর্যোগে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করছে প্রতিটি চিকিৎসক। প্রতিনিয়ত মানুষদের সেবা দিচ্ছে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।

এই পরিস্থিতিতে অনেকেই বলছেন কিছু চিকিৎসক রোগীদের সেবা প্রদানে অনীহা প্রকাশ করছে। কিন্তু এর পেছনেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে। বর্তমান সময়টা চিকিৎসকদের জন্য চ্যালেঞ্জের। গতকাল পুরো রাত রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে নির্ঘুম কাটাতে হয়েছে। অনেক সময় রোগীদের দেখতে গিয়ে আমাদের নানা পরিস্থিতির শিকার হতে হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে বেশির ভাগ সময় আমাদের পেশেন্টরা চেকআপ করাতে গিয়ে তাঁদের অসুস্থার কথাও আড়াল করছেন। এবং তারা কোথায় থাকেন তাও বলতে চান না। এর কারণ আমরা যদি সব জেনে চিকিৎসা না করি। যেমন সেদিন সহকারী এক চিকিৎসক রোগী দেখেছেন। পরে জানতে পারলাম তার সেই রোগীর রিপোর্টে করোনা পজিটিভ এসেছে। যার কারণে সেই চিকিৎসককে কোয়ারেন্টাইনে যেতে হয়েছে।

প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ জন রোগী দেখতে গিয়ে আমাদের মনেও কিছুটা ভয় সৃষ্টি হচ্ছে। তবুও এসবকে মানিয়ে আমাদের সেবাকে ধর্ম হিসেবে নিয়ে কাজ করছি। সারা দিন এত রোগী দেখে পরিবারের কাছে এখন চাইলেই মিশতে পারছি না। এমনকি আজ ১৫দিন যাবৎ আমার সন্তানদের থেকে আমি দূরত্ব বজায় রেখে আলাদা রুমে থাকছি। তারা বারবার আমার কাছে আসার চেষ্টা করলেও বাধা দিচ্ছি।

তবে এসব করার পরও যখন অনেকে চিকিৎসকদের সমালোচনা করেন তাদের উদ্দেশ্যে বলব এ সময়ে আমাদের পর্যাপ্ত পিপিই গাউন প্রয়োজন, আর সে সবই আমরা চহিদানুযায়ী পাচ্ছি না। আবার যেসব দেয়া হচ্ছে সেগুলো মানসম্মত নয়। তাই গুটিকয়েক চিকিৎসক সেবা প্রদানে অনুৎসাহী হচ্ছে। তবে তার কারণে গোটা ডাক্তার সমাজকে আপনাদের প্রশ্নবাণে জর্জরিত করবেন না। একটু খেয়াল করলেই সবাই দেখবেন পুরো বাংলাদেশের সিনিয়র বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা ২৪ ঘণ্টা নিজ উদ্যোগে টেলিমেডিসিন সেবা চালু করেছেন। এমনকি আমার নির্দেশনায় প্রায় দুই শতাধিক চিকিৎসক টেলিমেডিসিন সেবা দিচ্ছেন।

দিন শেষে এটুকু অনুরোধ অন্তত এ সময়ে চিকিৎসকদের তাদের কাজে উৎসাহিত করুন। প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট টাইমে যখন আমি বাসা থেকে হাসপাতালের দিকে যাত্রা করি, মাঝে মধ্যেই পুলিশের চেকপোস্ট আমার গাড়ি থামিয়ে দিলে যখনই দেখে আমার পরনে অ্যাপ্রোন, তখন তারা কি সুন্দর একটা স্যালুট দিয়ে রাস্তা থেকে সরে দাঁড়ায়। এসব দেখেই আমরা কাজের প্রতি আরও উৎসাহ অনুপ্রেরণা পাই।

পাঠকের কথা বিভাগের আরো খবর

আরও খবর