রংপুর সংবাদ » হারিয়ে যাচ্ছে আবহমান বাংলার অনেক কিছুই

হারিয়ে যাচ্ছে আবহমান বাংলার অনেক কিছুই


রংপুর সংবাদ ডেস্ক ফেব্রুয়ারী ১, ২০২১, ২:২৬ অপরাহ্ন
হারিয়ে যাচ্ছে আবহমান বাংলার অনেক কিছুই

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি থেকে অনেক কিছু হারিয়ে যাচ্ছে। পরিবর্তিত হচ্ছে অনেক বিষয়। ইংরেজি ও হিন্দির প্রভাবে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলা ভাষা আজ অসুস্থ।

এফএম রেডিও প্রতি মিনিটে বাংলা ভাষার অবমাননা করছে। বাংলা একাডেমি এ ব্যাপারে নীরব। বিশ্ববিদ্যালগুলোয় প্রায় আড়াই দশক হল শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভালোবাসা দিবসের চর্চা হচ্ছে।

পহেলা বৈশাখ ও থার্টিফার্স্ট নাইট পালিত হলেও শহুরে সমাজে এখন নবান্ন, পহেলা মহররম ও চৈত্রসংক্রান্তি উৎসব আকারে পালিত হয় না। শিশু-কিশোররা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার।

ভারতীয় স্যাটেলাইট সংস্কৃতির একতরফা প্রবাহ বাংলাদেশি বউ-ঝিদের মানসিকতা বিকারগ্রস্ত করে চলেছে। গঠনমূলক পরিকল্পনার অভাবে বাংলাদেশি সংস্কৃতি এর স্বকীয়তা হারাচ্ছে।

রক জ্যাজ, ডেথ মেটাল আর ব্যান্ডের শব্দে শহুরে কসমোপলিটন সংস্কৃতিতে এখন জারি, সারি, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, ঘেঁটু, গম্ভীরা, যাত্রা ও পালা গানের সুর কমই শোনা যায়। বিয়ের পালকি এখন জাদুঘরে। বর আসা শুরু হয়েছে হেলিকপ্টারে।

চারদিকে পরিবর্তনের হাওয়া। হারিয়ে যাওয়ার উৎসব। সব পরিবর্তন নেতিবাচক নয়। স্বতঃস্ফূর্ত পরিবর্তন গ্রহণীয়। তবে অন্যের প্রভাবে নিজের সত্তা হারানো আত্মঘাতী এবং অস্তিত্ব বিনাশকারী।

জলবায়ুর পরিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে কোলা ব্যাঙ, পাখি, নদী, পোকা, গাছ, মাছ, আরও অনেক কিছু। সাহিত্য থেকে প্রতিবাদ, রাজনীতি থেকে জনকল্যাণ, নির্বাচন থেকে ভোট, আর ভোট থেকে ইভিএমের কারিশমায় ব্যালট পেপার ও ব্যালটবাক্স হারিয়ে যাচ্ছে।

এভাবে সমাজ, রাজনীতি, সাহিত্য, সংগীত থেকে প্রতিনিয়ত অনেক কিছু হারাচ্ছে। হারাচ্ছে বাদ্য ও খাদ্য থেকেও বিস্তর।

তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে বার্গার, রোল, স্যান্ডউইচ আর পিজ্জার ঘনিষ্ঠতায় পায়েশ, পিঠা আর বাতাসার দেখা মেলে কদাচিৎ। তরুণ প্রজন্ম কি জানে শীতের সকালে খেজুরের রসে ভেজানো চিতই পিঠার স্বাদ? ফাস্টফুডের চাপে এরা পিঠা চেনে না।

শীতকালে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোয় পিঠা উৎসব করে পিঠার সঙ্গে এদের পরিচয় করাতে হয়। ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলের এক ছাত্র ধান গাছ সম্পর্কে পরীক্ষায় লিখেছে : ধান গাছের তক্তা দিয়ে ফার্নিচার তৈরি করা যায়। শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এ লজ্জা কোথায় রাখবে!

খেজুরের রসের পিঠা-পায়েশ আর গুড় কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হল খেজুরের গাছ কমে যাওয়া। তবে বাজারে অনেক খেজুরের গুড়। এগুলোর মধ্যে ভেজাল বেশি। ফ্লেভার দিয়ে তৈরি করা। খেজুরের গাছ বেশি হয় দেশের দক্ষিণাঞ্চলে।

অপরিকল্পিত উন্নয়নের জোয়ারে অনেক জমিতে খেজুরের গাছ কেটে তৈরি করা হয়েছে ইটের ভাটা। সেখানে ইট পোড়ানো হয়। তবে যেসব খেজুরের গাছ এখনো আছে সেগুলো কাটার জন্য গাছি পাওয়া যায় না। সবাই তো আর এ গাছ কাটতে পারেন না। এর জন্য পেশাদারিত্ব প্রয়োজন। গাছের বুক কেটে সেখান থেকে সুমিষ্ট রস বের করা এক ভিন্ন শিল্প।

আমার দৃষ্টিতে যারা খেজুর গাছ কাটেন তারা গাছি নন। তারা শিল্পী। তাদের জগতে তারা একেকজন জয়নুল আবেদিন, এসএম সুলতান। তাদের ধারালো দায়ে আছে শিল্পের ছোঁয়া। আর এ সম্পর্কে তাদের রয়েছে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান।

কতদিন পরপর গাছ কাটতে হবে, কীভাবে কাটলে গাছের ক্ষতি হবে না, কীভাবে নল লাগাতে হবে, কতদিন পরপর কীভাবে রসের ঠিলা পাততে হবে, কীভাবে গাছ বাঁচিয়ে রেখে তার বুক কেটে রস বের করে আনতে হবে, কখন মিষ্টি রস বের হবে, কখন টক রস (তাদের ভাষায় ‘ঝরা’) বের হবে-এ সবই তাদের জানা। এ এক ভিন্ন শিল্পকর্ম। তবে বাজারে গুড়ের অভাব না থাকলেও খেজুর গাছ কমে গেছে। কমে গেছে গাছিও।

কামারের ছেলে কামার, রাজমিস্ত্রির ছেলে রাজমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রির ছেলে রংমিস্ত্রি হলেও খেজুর গাছ কাটা গাছির ছেলে গাছি হচ্ছে খুবই কম। পর্যাপ্ত গাছ না থাকলে হবেই বা কেন? ফলে শহর এলাকায় খেজুর গাছ কাটার গাছি পাওয়া দুর্লভ।

খুলনা শহরে পৈতৃক বাস্তুভিটায় আমার আয়ত্তে (অন্য ভাইবোনসহ) ৩৫টি খেজুর গাছ। আমি শীতের শুরুতে অনেক খুঁজেও কোনো গাছি না পেয়ে রসের পিঠা-পায়েশ খাওয়ার আশা ছেড়ে দেই।

এমন সময় এক বন্ধু একেবারে ইলেভেনথ আওয়ারে সাহেব আলি নামের একজন ৭০ বছরের বৃদ্ধ গাছি নিয়ে হাজির। এ গাছি অন্যত্র গাছ কেটেছেন। প্রথমে তিনি বললেন, ‘বাবা আমার বয়স হইছে, আমি বেশি গাছ কাটতি পারি নে।’ পরে আমার বিনয়ী অনুরোধে সাহেব আলির মন নরম হল।

কিছু অগ্রিম টাকা আর গাছ ঝোড়ার সব পাতা তিনি নেবেন এবং রসের আধাআধি ভাগ হবে-এ শর্তে তিনি মাত্র ১৩টি গাছ কাটলেন। অনেক অনুরোধেও বাকি গাছগুলো তাকে দিয়ে কাটানো গেল না। তবে তিনি বললেন, ‘বাবা, সামনের বার যদি আল্লাহ বাঁচায় রাহে, তাহলি তোমার সব গাছ কাইটে দিবানি।’ আমি এতেই খুশি। খেজুরের রসের চিতই পিঠা আর পায়েশ খাওয়ার চিত্রকল্প বুকে ভেসে ওঠায় আনন্দিত ও শিহরিত হলাম।

সাহেব আলি বিচিত্র ধরনের লোক। খুব সহজ-সরল এবং অসম্ভব সৎ। তবে তার ভদ্রতাজ্ঞান ব্যতিক্রমী। সামনে বিড়ি ফুঁকলেও তিনি আমাকে খুব সম্মান করেন। রস পাড়ার সময় আমি তাকে সহায়তা করি। টুকটাক গল্প করি। তবে কবে গাছ কাটবেন জিজ্ঞেস করলেই তিনি বলেন, ‘তিন-চাইরদিন পরে কাটবানি।’ আমি বুঝব কী করে যে তিনি কবে গাছ কাটবেন।

কাজেই দু’-তিন দিন পর আমি প্রতিদিন সন্ধ্যায় গিয়ে দেখে আসি তিনি গাছে ঠিলে পেতেছেন কিনা। তার ফোন নম্বর চাইলে বললেন, ‘বাবা আমার এট্টা ফোন আছে। আমি টিপতিও পারি নে, করতিও পারি নে, ধরতিও পারি নে।’

কী আর বলব। ফলে সম্ভাব্য সময় হলে আমি প্রতিদিন সন্ধ্যায় একবার গিয়ে দেখে আসি গাছে ঠিলে পাতা হয়েছে কিনা। ঠিলে পাতলে পরদিন ভোরে হাজির হই।

সৎ হিসাবে পরিচিত সাহেব আলি রসে পানি মিশানোর চিন্তাও করেন না। তার ক্রেতা অনেক। রস ভাগাভাগি হওয়ার পর স্পটে এসে তারা তার কাছ থেকে নগদ টাকায় রস কিনে নিয়ে যান। অনেক অর্ডার। তিনি দিয়ে কুলাতে পারেন না। এর পরও একদিন ভাগে সোয়া দুই ঠিলে করে রস হলে সে দুই ঠিলে নিয়ে আমাকে বলেন, ‘আজকের রস খুব মিষ্টি হবেনে। এটুকু তুমি নিয়ে যাও।’

গরিব ও সৎ এ শিল্পীর প্রতি আমিও দরদি হই। আরেকদিন ভাগে পৌনে দুই ঠিলে করে রস হলে আমি বলি, ‘দেখুন আপনার ঠিলেটা না ভরলে তো কেউ কিনতে চইবেন না। আপনাকে ঠকাবেন। হয়তো আধা ঠিলে রসের দাম দিতে চাইবেন।

আপনি আমার ভাগ থেকে কিছু রস নিয়ে আপনার ঠিলেটা ভরে নিন। আপনার বিক্রয়ে সুবিধা হবে।’ বিস্ময়ভরা ঘোলা চোখে তিনি আমার দিকে তাকালেন। তারপর আমার ভাগ থেকে কিছুটা রস নিয়ে তার ঠিলে ভরে নিলেন।

আমি একটি তালিকা করি। কাকে কাকে খেজুর গাছের খাঁটি রস খাওয়ানো যায়। সে তালিকায় ঠাঁই পান গাছের অন্য মালিক, কতিপয় ঘনিষ্ঠ বন্ধু, একজন ছাত্র, দু’-তিনজন আত্মীয় এবং আমাদের খণ্ডকালীন কাজের মহিলা। তালিকাটি বেশ বড়।

আমরা দু’দিন খেয়েছি। তবে ইতোমধ্যে প্রায় ১০ জনকে দিতে পেরেছি। তালিকা শেষ হয়নি। এর কারণ চিন্তা করে দেখলাম, নিজে খাওয়ার চেয়ে অন্যকে রস বিতরণে আনন্দ বেশি। চলতি বাজার দরে এক ঠিলে রসের দাম ২০০ টাকা।

কিন্তু তা একজনকে তার বাসায় সাত সকালে দিয়ে এলে তিনি যতটা খুশি হন, তার দাম আমার হিসাবে ২ হাজার টাকা। সে জন্য ২০০ টাকার বদলে ২ হাজার টাকার দিকে ঝুঁকে পড়ি। আমার স্ত্রী আমার চেয়ে এক ডিগ্রি উপরে। রস বিতরণে আমি হাজি মহসিন হলে তিনি হাতেম তাই।

একদিন ফোন করে বললাম, আজকের রসের রং খুব ভালো। কড়া মিষ্টি হবে। আমাদের জন্য আনব। তিনি বললেন, না তালিকা অনুযায়ী দিয়ে এসো। আমরা পরে খাব। আমি এমফিল ছাত্রের মৌখিক পরীক্ষা নিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে গাছি একদিন রস বাসায় পৌঁছে দেন। স্ত্রী জানতে চাইলেন রস জ্বাল দেবেন কিনা।

আমি বললাম, তোমার মেসেঞ্জারে বন্ধু মঞ্জুরুল আলমের বাসার ঠিকানা পাঠিয়েছি। তুমি রিকশায় গিয়ে দিয়ে এসো। বাসা খুঁজে পেতে কষ্ট হলে বন্ধুকে ফোন দেবে, না পেলে দোকানে জিজ্ঞেস করবে। বন্ধু কিন্তু দোতলায় থাকে। সে ঠিকই নির্দেশনা মোতাবেক রস দিয়ে আসে এবং অনেক আনন্দ পায়। পরে আমাকে জানায়, ভাবি রসের পিঠা বানিয়ে তাকে সে ছবি মেসেঞ্জারে পাঠিয়েছে।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সম্মানিত নাগরিকদের বিনয়ের সঙ্গে একটি অনুরোধ করতে চাই। গাছ লাগানোর সময় আপনারা কেবল শাল, শেগুন, মেহগনি আর শিরিশ গাছ লাগাবেন না। জমির আইলে বা বাড়ির আঙ্গিনায় দু’-চারটা খেজুর গাছও লাগাবেন। তাহলে বৃক্ষরোপণের মধ্য দিয়ে আপনারা আমাদের সমৃদ্ধ খাদ্য সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে অবদান রাখতে পারবেন।

কারণ, খেজুর গাছের রস ও এর তৈরি পিঠা-পায়েশ আমাদের খাদ্য সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। একে হারাতে দেয়া যাবে না। হারাতে দেয়া যাবে না খেজুরের গাছ আর এ গাছ কাটা গাছি নামের সাহেব আলির মতো শিল্পীদের।

যাদের দায়ের শিল্পিত ছোঁয়ায় বোবা খেজুর গাছ আমাদের দেয় নিজের বুকের সুমিষ্ট রস। বাঁচিয়ে রাখে বাঙালির পিঠে-পায়েশের সংস্কৃতি। বাঁচিয়ে রাখে খেজুর গাছ কাটা শিল্পী সাহেব আলিদের