রংপুর সংবাদ » কলকাতার চিঠি… খুলেছে রেস্টুরেন্ট, সিনেমা হল, শপিং মল – স্কুল খুলবে কবে?

কলকাতার চিঠি… খুলেছে রেস্টুরেন্ট, সিনেমা হল, শপিং মল – স্কুল খুলবে কবে?


রংপুর সংবাদ জানুয়ারী ৮, ২০২১, ৭:৪২ অপরাহ্ন
কলকাতার চিঠি… খুলেছে রেস্টুরেন্ট, সিনেমা হল, শপিং মল – স্কুল খুলবে কবে?

কৌশিক চক্রবর্তী:

ভারতবর্ষের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী মঙ্গলবার ঘোষণা করেছেন যে নতুন বছরের জানুয়ারি আর ফেব্রুয়ারি মাসে বোর্ডের কোনও পরীক্ষা হবে না। শিক্ষকদের সঙ্গে ভার্চুয়াল এক বৈঠকের পর দেশের সাম্প্রতিক কোভিড পরিস্থিতি বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে যে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এই ২০২০-র শেষ প্রান্তে পৌঁছে যা দাঁড়িয়েছে, সেটা ২০২১ সালের জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারি মাসে দশম বা দ্বাদশ শ্রেণীর বোর্ড পরীক্ষা নেওয়ার মতো নয়। আর বোর্ড পরীক্ষা অনলাইনেও নেওয়া সম্ভব নয়।

কাজেই, আগামী দিনে আলোচনার মাধ্যমে পরবর্তী সময়সূচী স্থির হলে তা জানিয়ে দেওয়া হবে।
কেন্দ্রীয় সরকারের এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাভাবিক ভাবেই কিছু কথা ওয়াকিবহাল মহলে উঠছে। সেই ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে দেশের স্কুল কলেজ বন্ধ। ছেদ পড়েছে শিশু, কিশোর, কিশোরীদের স্কুলের সঙ্গে সম্পর্কে। দেশের কোভিড পরিস্থিতি ক্রমাগত খারাপ হতে হতে এই কটা মাস কেটে যাওয়ার পর আজ পিছন ফিরে দেখলে কিন্তু পরিষ্কার নজরে আসছে একটা ভেঙে পড়া ইমারতের ছবি। যে ইমারতটা গড়ে উঠেছিল তিলে তিলে শিক্ষা ব্যবস্থার ইঁট-কাঠ-পাথরে। যে ইমারতের স্থপতি ছিলেন দেশের লক্ষ লক্ষ সরকারি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মীরা। এই কোভিডের ধাক্কায় গোটা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাটাই কার্যত স্তব্ধ গত মার্চ মাস থেকে। ভরসা ভার্চুয়াল ক্লাস। সেই ভার্চুয়াল ক্লাস চলেছে এবং চলছে অনেক জায়গাতেই।

কিন্তু এতদিনে এটুকুও বোঝা হয়ে গেছে যে ভার্চুয়াল পড়াশুনা কখনই বেঞ্চ-ডেস্ক-ব্লাকবোর্ড-মাঠ আর কচিকাঁচাদের হইচই-এ ভরা ক্লাসঘর সমন্বিত স্কুলের বিকল্প হতে পারে না। তাছাড়া দেশের ছাত্রসমাজের এক বিশাল অংশ আজও ভৌগোলিক ভাবে ইন্টারনেট-এর আওতার বাইরে। অর্থাৎ ভার্চুয়াল ক্লাসে যোগ দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আর ভৌগোলিক ভাবে ইন্টারনেট-এর আওতায় থাকা ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যেও একটা বিরাট অংশ আর্থিক ভাবে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এদের না আছে ট্যাব, না আছে ফোন, না আছে কম্পিউটার, না ইন্টারনেট কানেকশন নেওয়ার আর্থিক ক্ষমতা। কাজেই আর্থিক অসঙ্গতির কারণেই সেই বিরাট সংখ্যক ছাত্রছাত্রী ভার্চুয়াল ক্লাস করতে পারে না।
তাহলে বিষয়টা যা দাঁড়ালো, সেটা হল, দেশের বর্তমান শিক্ষা পরিস্থিতি এক কথায় বর্ণনা করতে গেলে একটা ভয়াবহ ছবিই কিন্তু চোখের সামনে ভেসে উঠছে। প্রশ্ন ঊঠছে, এই ছবিটা পাল্টানোর সদিচ্ছা নিয়ে। এখানে শুধু সরকারকে দায়ী করে আর বোধ হয় পার পাওয়া যাবে না। কারণ, বন্ধ কল-কারখানা খোলার দাবিতে আন্দোলন করে যে মানুষ, কৃষিবিল প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলন করে যে মানুষ, দোকান বাজার-হাটে ভিড় ক’রে পুজো-পার্বণের কেনাকাটা করে যে মানুষ, সিনেমা-থিয়েটার হল খোলার দাবিতে পথে নামে যে মানুষ, রুটি-রুজিতে টান পড়েছে বলে ধর্ণায় বসে যে মানুষ, কোভিডের কারণে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাই ঠেকাতে মালিককে ঘেরাও করে যে মানুষ, সেই মানুষ কিন্তু দেশের স্কুল কলেজ খোলার দাবিতে পথে নামে না।

আর সে’কারণেই বোধ হয়, কোভিড পরিস্থিতিতে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়টা তুলণামূলক ভাবে কম গুরুত্ব পায়। শেষ পর্যন্ত ওটা এমন একটা ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়, যেটা কিনা ‘সাবধানতা অবলম্বন’-এর নামে পিছিয়ে দেওয়াই যায়। প্রশ্ন ওঠেনা, শিশু কিশোর, কিশোরীদের বাজার, হাট, দোকান-পাট, রেস্টুরেন্ট, সিনেমা হল, খেলার মাঠ রাস্তা-ঘাট কোথাও যেতে যখন বাধা দেওয়া হচ্ছে না, তখন স্কুল কলেজ কী দোষ করল! নাকি কোভিডের আসল ঘাঁটি স্কুলই! এক মাত্র স্কুল থেকেই কোভিড ছড়ায়!
এখানেই এসে যায় দ্বিতীয় প্রশ্ন। দেশে আগামী মাস থেকে যে কোভিড ভ্যাক্সিন জনগণকে দেওয়া হবে বলে আপাতত স্থির হয়েছে, তার আওতা থেকে প্রাথমিক ভাবে বাদ রাখা হয়েছে ১৮ বছরের কমবয়সী শিশু কিশোর কিশোরীদের। এর কারণ হিসাবে বলা হয়েছে, ১৮ বছরের কমবয়সীদের ওপর ভ্যাক্সিনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা তেমন ভাবে না হওয়ার কারণেই প্রাথমিক ভাবে তাদের এর আওতায় আনা হচ্ছে না। তাছাড়া বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব যেহেতু পঞ্চাশোর্ধ মানুষের ওপরই বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে কাজেই এখনই ১৮ বছরের কমবয়সীদের ভ্যাক্সিনের আওতায় আনার প্রয়োজন নেই।

মজার বিষয় হল, মূলত, এই বয়সী ছেলে মেয়েদের নিয়েই গড়ে ওঠে দেশের ছাত্রসমাজ। অর্থাৎ সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, এই ছাত্রসমাজকে প্রাথমিক ভাবে ভ্যাক্সিনের আওতায় বাইরে রাখলে ক্ষতি নেই। এদের কোভিড আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। প্রশ্ন হল, তাই যদি হবে, তাহলে এরা স্কুলে গেলে সমস্যাটা কোথায়? আজ যখন রাস্তাঘাটে গণ পরবহণের সমস্যা অনেকটাই কমে এসেছে, চালু হয়েছে ট্রেন, বাস, সেখানে ছাত্রছাত্রীদের স্কুলে যাওয়ার সমস্যা কোথায়?

এটুকু এত দিনে কিন্তু বেশ বোঝা হয়ে গেছে, যে যতই ভ্যাক্সিন আসুক, মাস্ক, স্যানিটাইজার আর সোশাল ডিস্টেন্সিং এখন থেকে জনজীবনের অন্যতম এক অঙ্গে পরিণত হয়েছে এবং আগামী দিনেও এর থেকে মুক্তি নেই। তাহলে সেই নিয়মকানুন মেনে যদি দেশের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রের হোটেল রেস্টুরেন্ট পর্যন্ত খুলে দেওয়া যায়, যেখানে সোশাল ডিস্টেন্সিং শিকেয় তুলে হাজার হাজার ১৮ বছরের কম বয়সী ছেলে মেয়ে ভিড় জমাতে পারে, আর তাতে যদি সরকার, পর্যটন উন্নয়নের নামে উৎসাহ দিতে পারে, তাহলে স্কুলে যাওয়া ঠেকাতে কেন ‘সাবধানতা অবলম্বন’-এর কথা ওঠে।
অনেকে অনেক কথা বলছেন। এমন কথাও ভেসে বেড়াচ্ছে, যে ১৮ বছরের কমবয়সীরা ভোট দেন না বলে তাদের কথা ভাবার তাগিদও কম। ফলে, স্কুল খোলার বিষয়টি পিছিয়েই চলেছে। ১৫ অক্টোবরের পর কিছু রাজ্য কিছু স্কুল খোলার চেষ্টা চালালেও বড় মাপের সাফল্য আসেনি। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, দেশের ছাত্রছাত্রীদের এক বিরাট সংখ্যক অভিভাবক কিন্তু বিষয়টা নিয়ে লাগাতার দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। বিভিন্ন ভাবে জানার চেষ্টা চালাচ্ছেন, স্কুল কবে খুলবে।

সন্তানদের ভবিষ্যৎ চিন্তায় তাঁদের ঘুম উড়েছে। কিন্তু তাতে লাভ কিছু হচ্ছে না। তাঁদের সকলের চিন্তাটা এক জোট হয়ে আন্দোলনের রূপ নিয়ে সরকারের মসনদ পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না। নিজের জীবন জীবিকার সমস্যায় জর্জরিত মানুষ, সন্তানের শিক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তা করলেও কোনও পদক্ষেপ নিতে দু’বার ভাবছেন। তাই বক্তব্যটা ঠিক দানা বাঁধছে না।

ইতিমধ্যে এসে পড়েছে ভাইরাসের নতুন স্ট্রেন। ভারতবর্ষে যদিও এখনও এর সন্ধান মেলেনি, তবুও ভয়টা কিন্তু রয়েই গেছে। এই নতুন রূপের কোভিডের মোকাবিলায় বৃটেন আজ কার্যত একঘরে। ভারত, ইতালি, স্পেন, জার্মানি, কানাডা, কুয়েত সহ ২২টি দেশ, বৃটেনের উড়ান বন্ধ রেখেছে। কাজেই ‘সাবধানতা অবলম্বন’-এর আরও কারণ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, এ’বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।