শনিবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২১, ০৮:২৭ পূর্বাহ্ন

কোভিড ভ্যাকসিন- স্রোতের বিপরীতে ইন্দোনেশিয়া

রংপুর সংবাদ
  • প্রকাশের সময়ঃ বৃহস্পতিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২০

কৌশিক চক্রবর্তী :
২০২০ সাল শেষ হওয়ার আগেই বাজারে এসে গেছে কোভিড ভ্যাক্সিন। কাজেই আপনার ভ্যাক্সিন নেওয়া এবার শুধু সময়ের অপেক্ষা। আপনার কাছে প্রশ্নটা সরল হলেও সরকারের কাছে কিন্তু ব্যাপারটা এতটা সরল নয়। কাদের প্রথমে দেওয়া দরকার ভ্যাক্সিন? কাদের প্রথম সুরক্ষিত করা দরকার? বয়স্ক, অশক্ত, অন্যান্য রোগাক্রান্ত মানুষদেরই প্রথম দেওয়া হবে ভ্যাক্সিন, নাকি কমবয়সীদেরই আগে দেওয়া দরকার? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা বৃটেন-এর মতো দেশগুলি যেখানে প্রথমেই বয়স্ক এবং ডাক্তার, নার্স বা চিকিৎসার কাজে

সরাসরি জড়িতদের এই ভ্যাক্সিন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং সেই মতো কাজও শুরু করে দিয়েছে, জনসংখ্যার নিরিখে বিশ্বের চতুর্থ বৃহৎ দেশ ইন্দোনেশিয়া কিন্তু স্রোতের বিপরীতে হেঁটে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, প্রথমে ভ্যাক্সিন দেওয়া হবে কমবয়সীদের। বয়স্ক মানুষদের দেওয়া হবে তার পরে। প্রশ্ন উঠছে, কেন এই সিদ্ধান্ত? এই সিদ্ধান্ত কি অমানবিক? এ’বিষয়ে আসার আগে ভ্যাক্সিন নিয়ে বিশ্বের আর একটি দেশের ভাবনাচিন্তা একটু খতিয়ে দেখা যাক।

দেশটির নাম জাপান। খেয়াল করলে নিশ্চয়ই দেখে থাকবেন, পৃথিবীর বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণার ক্ষেত্রে একেবারে সামনের সারিতে রাখা হয় যে দেশটিকে, আশ্চর্য ভাবে কোভিড ভ্যাক্সিন গবেষণা বা এই ভ্যাক্সিন নিয়ে পৃথিবী জোড়া ঘোড়দৌড়ে একেবারেই নিশ্চুপ সেই দেশ। অনেকে বলছেন কোভিডের প্রভাব যে দেশে যৎসামান্য, সেই দেশ খামোখা তা নিয়ে লাফালাফি করবেই বা কেন? তবে, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অনলাইন সমীক্ষা সংস্থা, ‘ইপ্সস’ গত অক্টোবর মাসে একটি সমীক্ষা চালায় বিশ্বের ১৫টি দেশের ১৮ থেকে ৭৪ বছর বয়স্ক, ১৮,৫২৬ জন মানুষের মধ্যে। ‘কোভিড ভ্যাক্সিন বাজারে এসে গেলে আপনি কি তা নিতে ইচ্ছুক হবেন?’ এই প্রশ্নের উত্তরে সারা পৃথিবীর ৭৩% মানুষ যখন ‘হ্যাঁ’ বলেছিলেন, জাপানে সেই ‘হ্যাঁ’ শোনা গেছিল ৬৯% মানুষের কন্ঠে।

আরও মজার ব্যাপার হল, এই জাপানেই কিন্তু, গত অগাস্ট মাসে এই একই সমীক্ষায় ‘হ্যাঁ’ বলেছিলেন ৭৫% মানুষ। অর্থাৎ, সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ভ্যাক্সিন নেওয়ার আগ্রহটা এই ক’মাসে ক্রমশ কমেছে সেই দেশে। প্রশ্ন হল, কেন? অবশ্য এই আগ্রহ ক্রমশ কমেছে ভারত বাদে কম বেশি সব দেশেই। এর মধ্যে সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য চিন। সেখানে অগাস্টের সমীক্ষায় ৯৭% মানুষ ‘হ্যাঁ’ বলেছিলেন, অক্টোবরের সমীক্ষায় সেটা কমে দাঁড়িয়েছে ৮৫%-এ। তবে জাপানের ক্ষেত্রে বিষয়টা অবশ্যই একটু আলাদা। কারণ, ভ্যাক্সিন নিয়ে অতীত অভিজ্ঞতা খুব সুখকর নয় জাপান সরকারের।

যে জাপান, বিভিন্ন ভ্যাক্সিন গবেষণায় একসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করত এবং যে জাপান সরকারের উদ্যোগে হাম, মাম্পস বা রুবেলার এমএমআর ভ্যাক্সিন এসেছিল, নয়ের দশকে এই ভ্যাক্সিন-এর পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া সংক্রান্ত একাধিক মামলায় রীতিমতো নাস্তানাবুদ হতে হয় সেই জাপান সরকারকে। তারপর থেকেই ভ্যাক্সিন সংক্রান্ত ব্যাপারে ধীরে চলো নীতি নিয়ে চলেছে সে দেশের সরকার। এমনকি ১৯৯৩ সালে এমএমআর ভ্যাক্সিন প্রকল্প বন্ধও করে দেওয়া হয় জনগণের বিক্ষোভের দরুণ। আর সরকারের এই রয়ে সয়ে চলার নীতিতেই ধাক্কা এসেছে সেদেশের ভ্যাক্সিন গবেষণা সংক্রান্ত কাজকর্মে। এই সংক্রান্ত গবেষণার কাজে দেখতে দেখতে পিছিয়ে পড়েছে জাপান। আজও সেদেশের মানুষ সব চেয়ে ভয় পান ভ্যাক্সিনের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া বা পরিভাষায় যাকে বলে সাইড-এফেক্ট-কে। ‘ইপ্সস’-এর সমীক্ষাতেও উঠে এসেছে সেই ছবি। দেখা গেছে জাপানের ৬২% মানুষ কোভিড ভ্যাক্সিনের সাইড এফেক্ট নিয়ে সন্দিহান এবং চিন্তিত। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সে’দেশে মানুষকে নিখরচায় ভ্যাক্সিন দেবে জাপান সরকার। এই মর্মে একটি বিল ডায়েট-এ পাশও হয়ে গেছে।
এত কথার অবতারণার কারণ, মানুষের মনে ঘনিয়ে আসা কোভিড ভ্যাক্সিনের সাইড এফেক্ট সংক্রান্ত আশঙ্কার কালো মেঘের কিছু নমুনা তুলে ধরা। এমন পরিস্থিতিতেই খবর এসেছে, বৃটেনের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসেস-এর দুই কর্মী, যাঁদের অ্যালার্জির ধাত ছিল, তাঁরা ভ্যাক্সিন নেওয়ার পরই নানান সমস্যা দেখা দিয়েছে। আর, এরপরই মেডিসিন অ্যান্ড হেলথকেয়ার প্রোডাক্ট রেগুলেটরি এজেন্সি (এমএইচআরএ) সাবধান করে দিয়ে বলেছে, যাঁদের পুরোনো বড় রকম অ্যালার্জির ধাত রয়েছে, তাঁরা এই ভ্যাক্সিন নেবেন না।

এই প্রসঙ্গেই এসে পড়েছে ইন্দোনেশিয়ার নাম। সে দেশের সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, প্রথমেই কোভিড ভ্যাক্সিন বয়স্ক মানুষদের দেওয়া হবে না। এটা খুবই স্বাভাবিক, যে অনেকেই এই সিদ্ধান্তে একটা অমানবিকতার গন্ধ পাচ্ছেন, কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে একটা অন্য ছবিও স্পষ্ট হচ্ছে। কমবয়সী মানুষদের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া সামলানোর ক্ষমতা অপেক্ষাকৃত বেশি, এটা যেমন অনেকেই এই সিদ্ধান্তের পিছনের একটা কারণ বলে মনে করছেন, জাকার্তার ইজিকম্যান ইন্সটিটিউট অফ মলিকিউলার বায়োলজির ডিরেক্টর, আমিন সোব্যান্ড্রিও জানিয়েছেন, তাঁরা প্রথমেই এমন মানুষদের এই ভ্যাক্সিন দিতে চান, যাঁরা কর্মক্ষম এবং কাজের সুবাদেই এখানে ওখানে ঘোরাঘুরি বেশি করেন।

এঁদের মাধ্যমেই এই রোগ যেহেতু দ্রুত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে, তাই এঁদেরই আগে রোগের প্রকোপ থেকে বাঁচানো দরকার। এঁদের মধ্যে একবার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়ে গেলেই, পরিভাষায় যাকে বলে হার্ড ইমিউনিটি, সেই দিকে বেশ কয়েক কদম এগিয়ে যাওয়া যাবে। আর বয়স্ক, অশক্ত মানুষদের চলচ্ছক্তি এবং গতিবিধি যেহেতু এমনিতেই কম, কাজেই তাঁরা কোভিড ছড়ানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেন না।

প্রাথমিক ভাবে ভাবা হয়েছে, ইন্দোনেশিয়ার ১৮ থেকে ৫৯ বছর বয়সীদেরই প্রথম দেওয়া হবে ভ্যাক্সিন। তাঁদের মধ্যেও চিকিৎসার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ডাক্তার নার্স বা অন্যান্যরা গুরুত্ব পাবেন। এঁদের পরে এই ভ্যাক্সিন পাবেন ষাটোর্ধ মানুষরা। সরকারের হিসাব অনুযায়ী ২৪ কোটি ৬০ লক্ষ ভ্যাক্সিনেই তৈরি হয়ে যাবে হার্ড ইমিউনিটি। ওই সংখ্যক ভ্যাক্সিন, দেশের ১৮ থেকে ৫৯ বছর বয়স্ক জনসংখ্যার ৬৭% অর্থাৎ ১০কোট ৭০ লক্ষ মানুষকে দিতে কাজে লাগবে। তবে এই সংখ্যক মানুষ কিন্তু মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪০%-এর কাছাকাছি। কাজেই কোনও দেশে হার্ড ইমিউনিটি তৈরির ক্ষেত্রে জনসংখ্যার যত শতাংশ মানুষকে ভ্যাক্সিন দিতে হয় সেই প্রচলিত সংখ্যার চেয়ে সেটা অনেকটাই নিচে।

ভিন্ন মতের কিছু মানুষের বক্তব্য, ইন্দোনেশিয়া মুখ্যত ব্যবহার করবে চিনের তৈরি ‘সিনোভ্যাক’ ভ্যাক্সিন। বয়স্ক এবং অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের ওপর যার প্রভাব এখনও নাকি খতিয়ে দেখাই হয়নি। কাজেই ইন্দোনেশিয়া সরকারের এই সিন্ধান্ত না নিয়ে উপায় ছিল না। এ’ব্যাপারে সবচেয়ে খোলাখুলি বলেছেন ‘ইন্দোনেশিয়া বায়োএথিকস ফোরাম’-এর সভাপতি, জোহান্সজা মারজোইকি।

তাঁর যুক্তি, অজানা ভ্যাক্সিন নিয়ে পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হলে তা সামলাতে পারবে এমন মানুষদেরই প্রথম এই ভ্যাক্সিন নেওয়া উচিত। কাজেই, অমানবিকতা নয়, ঘোর বাস্তব বোধই হয়তো কাজ করছে ইন্দোনেশিয়ার এই সিদ্ধান্তের পিছনে, এমনটাই ওয়াকিবহাল মহলের মত। আশা করা যায় আগামী মাস দুয়েকের মধ্যেই এই সিদ্ধান্তের ভালো বা খারাপ দিক মানুষের নজরে আসবে। আমাদেরও নজর থাকবে সেই দিকেই।

Print Friendly, PDF & Email
এ বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © Rangpur Sangbad
Design & Develop By RSK HOST