রংপুর সংবাদ » আকাশে সূর্যের দেখা নেই : শৈত্যপ্রবাহে বিপর্যস্ত উত্তরাঞ্চল

আকাশে সূর্যের দেখা নেই : শৈত্যপ্রবাহে বিপর্যস্ত উত্তরাঞ্চল


রংপুর সংবাদ ডিসেম্বর ২০, ২০১৯, ১১:০৬ পূর্বাহ্ন
আকাশে সূর্যের দেখা নেই : শৈত্যপ্রবাহে বিপর্যস্ত উত্তরাঞ্চল

নিউজ ডেস্কঃ

ঘন কুয়াশার সঙ্গে চলছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। তীব্র শীত আর হিমালয়ের হিমেল বাতাসে বিপর্যস্ত রংপুরসহ  উত্তরাঞ্চল। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ। চরাঞ্চল ও ফুটপাতে বসবাসকারী সহায়-সম্পদহীন, ছিন্নমূল মানুষের জন্য এবারও শীত এসেছে অভিশাপ নিয়ে। এসব দরিদ্র ছিন্নমূল মানুষের দৃষ্টি এখন সমাজের বিত্তবানদের দিকে।

আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রংপুর বিভাগে সর্বনিম্ন তাপামাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে কুড়িগ্রামের রাজারহাটে। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯ দশমিক আট ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল। গতকাল বৃধবার রংপুরে সর্বনি¤œ তাপমাত্রা ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলেও গত বৃহস্পতিবার তা নেমেছে এসেছে ১১ ডিগ্রিতে ।

এছাড়াও উত্তরের  হিমালয়ের কাছাকাছি জেলা পঞ্চগড়ে সর্বনি¤œ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০ দশমিক আট ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা গতকাল বুধবার ছিল ১২ দশমিক ছয় ডিগ্রি।

রংপুর আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজার রহমান জানায়, এবার রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলে বইছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। প্রতিদিন শীতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় তাপমাত্রা সর্বনি¤œ ৮ ডিগ্রিতে নামতে পারে। তবে ২১ ডিসেম্বরের পর তাপমাত্রা কিছুটা বাড়তে পারে। কিন্তু জানুয়ারির শুরুতে আবার শৈত্যপ্রবাহ হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।

জানা গেছে, গত সোম ও মঙ্গলবার সূর্যের দেখা মিললেও বুধবার থেকে ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, গাইবান্ধা, দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলের আকাশ। যেন আকাশের বুক থেকে নিখোঁজ হয়েছে সূর্য। সন্ধা হলেই ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে হাট-বাজার, রাস্তাঘাটগুলো। সন্ধার পর থেকেই শীতের তীব্রতা অনুভূত হওয়ার পাশাপাশি ঘন কুয়াশা পড়ছে এই অঞ্চলে। গত পাঁচদিন ধরে কুয়াশার চাদরেবন্দি থাকছে বিস্তীর্ণ জনপদ। সারাদিন অবাধি ট্রেন, বাসসহ বিভিন্ন যানবাহনকে লাইট জ্বালিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে।

পৌষের শুরুতেই শীতের এমন তীব্রতায় শঙ্কিত এ অঞ্চলের অসহায় দরিদ্র মানুষ। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র না থাকায় দরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষদের দুর্ভোগ বেড়েছে কয়েকগুণ। তিস্তা, ধরলা, ঘাঘট, করতোয়া ও ব্রহ্মপুত্র নদের বিভিন্ন চরাঞ্চলে বসবাসকারী হাজার হাজার পরিবার শীতে মানবেতর দিন কাটাচ্ছে। তাদের মাঝে এখন পর্যন্ত কোনও শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়নি।

বৃহস্পতিবার সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকে শীতের তীব্রতা অনেকটা বেড়েছে। শীতের কনকনে ঠাণ্ডা আর কুয়াশায় সাধারণ মানুষেরা ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। কৃষকেরা তীব্র ঠাণ্ডায় কয়েক দিন থেকে কাজকর্ম করতে না পেয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে শুরু করে চরাঞ্চলের শিশু বৃদ্ধ সকলেই খড়কুটা জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন। চরম ভোগান্তিতে পড়েছে তারা।

এদিকে শীত মোকাবেলায় সরকারিভাবে শীতার্ত মানুষদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরন গেছে। তবে বেসরকারিভাবে এখন পর্যন্ত কোন উদ্যোগ তেমন চোখে পড়েনি। সরকারি হিসেবেই রংপুরাঞ্চলে অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা লক্ষাধিক।

তাদেরকে সরকার ভিজিএফ, ভিজিডিসহ নানা প্রকল্পের মাধ্যমে সহযোগিতা করে থাকে। কিন্তু এইসব অতিদরিদ্র মানুষের শীত নিবারণের জন্য গরম কাপড় কেনার তেমন একটা সামর্থ থাকে না। প্রতি বছরই শীতে তাদের অবস্থা কাহিল হয়ে পড়ে। চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েন এসব অতিদরিদ্র মানুষ। দেখা দেয় মানবিক বিপর্যয়। আর প্রতি বছরই এই অঞ্চলে শীতের তীব্রতায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে।

রংপুর ও দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলা বিভিন্ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, শীতের তীব্রতা ক্রমেই বেড়ে যাওয়ার কারণে এই অঞ্চলে শীত জনিত রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। মেডিকেল কলেজ হাসাপাতাল, জেলা ও উপজেলা সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বেসরকারি ক্লিনিক এবং লোকালয়ের পল্লী চিকিৎসকদের চেম্বারেও রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরমধ্যে বেশির ভাগই নিউমোনিয়া, সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্টের রোগী।

এদের মধ্যে শিশু ও বৃদ্ধ রোগীর সংখ্যাই বেশি। আবহাওয়া পরিবর্তন জনিত কারণে নিউমোনিয়া, জ্বর সর্দি কাশিসহ শীত জনিত রোগের মাত্রা বেড়ে যায় বলে হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছে। কোনভাবেই যেন শিশু ও বৃদ্ধের ঠাণ্ডা না লাগে সেদিকে খেয়াল রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

কাউনিয়ার চরচতুরা গ্রামের মিনারা বেগম (৫৫) জানান, ঠাণ্ডার কারণে দুপুরে গড়িয়ে যাচ্ছে ঘর থেকে বের হবার পাই না। পেটভরি ভাত খাতি পাই না তার উপর গরম কাপড় কিনার টাকা জোড়ার করমো কী করি।

হারাগাছ গফুরটারী গ্রামের দিনমজুর মমেনা বেওয়া (৫২) বলেন, এমনিতেই কারখানাত কাম নাই। ঠিকমতো খাবার জোটে না। তার ওপর ঠাণ্ডায় ঘরের বাইরত (বাহিরে) বের হবার পাচ্ছি না। জাম্পার (গরম কাপড়) কিনম কী দিয়া। গতবছর এ্যাকখান পাতলা কম্বল পাছনো। এবার তাও ছিড়ে গেইছে। এ্যালাও কায়ও কম্বল দেয় নাই।

গঙ্গাচড়ার তিস্তাপাড়ের চর ইছলী গ্রামের কৃষক জামাল মিয়া বলেন, “প্রতিদিন দুপুরের পরে শীতের তীব্রতা বাড়তে শুরু করে। এই শীতে কাজকর্ম করতে না পেরে ঘরে বসে দিন কাটাচ্ছি”।

কালীগঞ্জের তিস্তাপাড়ের সুমন মিয়া বলেন,”কষ্ট হলেও এই শীতের মাঝে কাজে যাচ্ছি। কাজ না করলে যে পুরোদিন না খেয়ে থাকতে হবে”।

রংপুরের জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা এটিএম আখতারুজ্জামান জানান, গত নভেম্বরে যে পরিমাণ বরাদ্দ পাওয়া গিয়েছিল। ইতিমধ্যে জেলার সব উপজেলায় ৬৪ হাজার ৩৫০টি শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে। আরো শীতবস্ত্রের বরাদ্দ চেয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হবে।

রংপুর জেলা প্রশাসক আসিব আহসান বলেন, শীত মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে কোন দুর্যোগ মোকাবেলায় আমরা প্রস্তুত আছি। আমাদের শীতবস্ত্র বিতরণ কর্মসূচী অব্যাহত রয়েছে। নতুন করে আরও বেশি শীতবস্ত্রের চাহিদা পাঠনো হবে। সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা করারও তিনি আহ্বান জানান।

রংপুর জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ হিরম্ব কুমার রায় জানান, প্রতিবছরই শীত মৌসুম এলে রোগবালাই কিছুটা বাড়ে। এনিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আমাদের মেডিকেল টিম সব সময় প্রস্তুত রয়েছে। এছাড়াও শীতের এ সময়ে শিশুদের একটু সমস্যা বেশি হয়। সে কারণে শিশুদের গরম কাপড় গায়ে রাখতে হবে। শিশুরা যেন ঠাণ্ডায় না থাকে সে কারণে অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে।