রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২০, ০৯:০৯ পূর্বাহ্ন

ব্রহ্মপূত্র নদ ও সাহেবের আলগা আখ্যান

রংপুর সংবাদ
  • প্রকাশের সময়ঃ মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২০

ডেস্কঃ১৯৯৮ সাল। আমরা ৮জনের একটি টিম নিয়ে কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের বকসীগঞ্জ নৌঘাট দিয়ে উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা ইউনিয়নের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। নৌকার মাঝির নাম আব্দুল। ওই এলাকাতেই তার বাড়ি। সাথে তার ভাতিজা ফয়জার আলী। আমরা কুড়িগ্রাম থেকে কেউ মোটর সাইকেলে কেউবা বাই সাইকেলে বকসীগঞ্জ এলাম।

মোটর সাইকেল ও বাই সাইকেল বকসীগঞ্জের অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক কফিল মাস্টারের বাড়িতে রাখা হল। ওনার এলাকার নামটা বেশ চমৎকার ‘অগুড়ার পাড়।” কে এই নাম রেখেছে তা জানা হয় নাই। আমি চমৎকার কিছু গ্রামের নাম পেয়েছি। তার মধ্যে এটি একটি। আমরা বকসীগঞ্জ দিয়ে ধরলা নদী ধরে ব্রহ্মপূত্র নদে গিয়ে পরলাম। তখন প্রচুর সিগারেট আর বিড়ি খেয়েছি। আমার শাশুড়ি সেটি পছন্দ করতেন না। অবশ্য কোনদিন সেটা প্রকাশও করেননি। ২০০১ সালের ১৩ মে ধুমপান ও পান খাওয়া ছেড়েছি। আজও সেই অভ্যাসটি ধরে রেখেছি। কিন্তু আফসোস আমার শাশুড়ি জীবিত অবস্থায় আমার এই পরিবর্তনটুকু দেখে গেলেন না।
আমি দীর্ঘদিন ব্রহ্মপূত্র নদকে কাছ থেকে দেখেছি। তার জলে নেয়েছি। মাছ ধরেছি। হাঁটু জলে মোটর সাইকেল দাবড়িয়েছি। হিংস্র ভাঙন দেখে আবার আঁতকে উঠেছি। দীগন্তজোড়া পলিমাটির স্তর দেখে কৃষকের সাথেও আমিও হেসেছি। দুইবার নৌকা ঝড়ের কবলে পরে মরতে মরতে কিভাবে যেন বেঁচে গেছি। সেসব আজ ইতিহাস। ব্রহ্মপূত্র নদ যখন শান্ত থাকে তখন দীঘির জলের মত শান্ত দেখায়। আর যখন উন্মত্ততা শুরু করে, তখন তার রুদ্ররুপ সত্যিই ভয়ংকর! নদী বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে জেনেছি, পৃথিবীর মধ্যে যত নদী আছে তাদের মধ্যে ভাঙনের একটা নিজস্ব প্যাটার্ণ আছে। কিন্তু ব্রহ্মপূত্র নদ কখন কোথায় ভাঙবে বা সড়ে যাবে তা বোঝা খুবই দুষ্কর। আমরা ধরলা নদী পেরিয়ে ব্রহ্মপূত্রে যখন উঠলাম তখন সামনে একটি চর দেখা গেল। আব্দুল মাঝি বলল, ওটা চর দুর্গাপুর। ক্ষয়ে যাওয়া একটি চর অল্প কিছু বসতি লক্ষ করলাম। তবে পুরো চরে কাশিয়া দিয়ে ভর্তি। চর দুর্গাপুরকে বায়ে রেখে আমরা বকসীগঞ্জ থেকে পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব ও কিছুটা দক্ষিণে হেলে চলেছি। ডানদিকে একটি চর পাশ কাটাতে আব্দুল মাঝি বলল, ওটা কাজিয়ার চর। অনেকে নাজমার চরও বলে। জানতে চাইলাম. নাজমার চর কেন? বলল, নাজমা নামে এক মেয়েকে নিয়ে গন্ডগোল হওয়ায় ওটাকে কেউ কেউ নাজমার চর বলে। নাজমার চরের সোজা দক্ষিণের চরটির নাম চর বাগুয়া সেখানে সাহেবের আলগা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান লুৎফা বেগমের বাড়ি। তার বাড়ি তখন ভেঙ্গে যাচ্ছে। তারা সেখান থেকে অন্যত্র সড়ে যাচ্ছে। আরো দক্ষিণে যে চরটি আছে তার নাম সুখের বাতির চর। আমি চরে যত চর দেখেছি তখন সুখের বাতি ছিল উত্তর-দক্ষিণে সবচেয়ে বড় একটি লম্বাকার চর। সেখানে বেসরকারি সংস্থা আরডিআরএস’র অফিস ছিল। রান্নার জন্য বাবুর্চি ছিল। সেই চরে লাল মেম্বার (শাহজামাল চেয়ারম্যান) এর বাড়িতে পরে থেকেছিলাম। সেটাও একটা গল্প। সুখের বাতির দক্ষিণে লেজের মত ছিল চিলমারী উপজেলার নয়ারহাট ইউনিয়নের নাইয়ার চর ও বাজার।
আমরা যখন সাহেবের আলগা ইউনিয়নের দিকে এগুচ্ছি। তখন স্রোতও বেড়ে যাচ্ছে। পরে জেনেছি ব্রহ্মপূত্র নদের বড় উৎস মুখের একটি বড় অংশ হল সাহেবের আলগা ইউনিয়নের এই খোলা প্রান্তরটি। এই পথ দিয়ে ভারতীয় পণ্যবাহী জাহাজগুলো চিলমারী হয়ে বাহাদুরাবাদ দিয়ে পায়রা বন্দরের দিকে যায়।

আমাদের দলনেতা এবং চর এলাকার মানুষ আব্দুল লতিফ ভাই দলটির থাকবার জন্য আগেই একজনের সাথে কথা বলে রেখেছিলেন। আমরা নৌকা থেকে নেমে তার নির্দেশমত সাহেবের আলগা ইউনিয়নের চৌকিদার মামুদ আলীকে খুঁজতে লাগলাম। কিছুদূর হেঁটে এগুতেই তার বাড়ির সন্ধান পেলাম। সে তখন বাড়িতে ছিল না। তার দুজন স্ত্রী আমাদের বসতে দিল। সেখানেই আমাদের পুরো টিমের একসাথে কেটে গেল পুরো একটা বছর। মামুদ আলী চৌকিদারের চারটি ঘরের মধ্যে আমরা দুটি ঘর দখল করে নিলাম। একটি ছেলেরা আর অন্যটিতে মেয়েরা।

পুরো চরটি তখন বালুময়। এখানে কালাই, পাট, বাদাম, কাউন, প্যারা (গম জাতীয় ফসল) মাঠে দন্ডায়মান দেখলাম। বেশির ভাগ বাড়ি ছনের তৈরী। কিছু থাক বা না থাক প্রতিটি বাড়িতে জিগাগাছ ও কলাগাছ রয়েছে। আম-কাঁঠাল গাছের দেখা পাওয়া দুষ্কর। প্রতি বছর বন্যার পানি এসে এসব গাছ খেয়ে ফেলে। চরে জিগাগাছের প্রচুর ব্যবহার হয়। এমনও দেখা যায় ঘরে ব্যবহ্নত মরা জিগাগাছ থেকে আবার ডালপালা গছিয়েছে।

দুপুরে খেতে গিয়ে গোল বাঁধল। নতুন একটি ছেলে টিমে যোগ দিয়েছে। সবাই খেল কিন্তু ছেলেটি ভাত নাড়াচাড়া করে উঠে চলে গেল। টিমের নারী সদস্য ও সম্পর্কে আমার শ্যালিকা শিল্পী বলল, সুকান্ত সেন নামের ছেলেটি কিছুই খেতে পারছে না। ও ঝাল একদম সহ্যই করতে পারছে না। পরে শিল্পী নিজে ডিম ভেজে খাওয়াতে গেল। টিমের নারী সদস্য লাকী, রাশিদা ওরাও সাথে গেল। আমি, রতন কুমার, ইঞ্জিনিয়ার নজরুল ও ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুর রাহী, ইঞ্জিনিয়ার রফিক সোনার ও ইঞ্জিনিয়ার লম্বা রফিক গ্রামটা ঘুরতে বের হলাম। সবাই আমাদেরকে অবাক ও উৎসুখ চোখে দেখছে। অল্প বয়সী মেয়েরা শাড়ি পরে গিন্নি হয়ে গেছে। এখান থেকে কাছাকাছি বাজার গেন্দার আলগার দুরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার। সবাই মিলে বাজার করতে গিয়ে জানলাম সাহেবের আলগায় কোন ইউনিয়ন পরিষদ ভবন নেই। গেন্দার আলগায় একটি ভবনে ইউনিয়ন পরিষদের কাজ করা হয়। বুড়াবুড়ির বক্সীগঞ্জ থেকে সাহেবের আলগার দুরত্ব নদী পথে প্রায় ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার। সাহেবের আলগার পূর্ব-দক্ষিণে রৌমারী উপজেলা। দুরত্ব প্রায় ১৫ থেকে ১৭ কিলোমিটার। সাহেবের আলগার পূর্বেই ভারতীয় সীমানা। আরো বলতে গেলে এই চরের পূর্ব-দক্ষিণে একই সীমানায় চর কাতলামারীর সাথেই রয়েছে ভারতীয় একটি গ্রাম। যেখানে বিএসএফ টাওয়ার রয়েছে। রয়েছে ভারতীয় ৩০/৩৫টি পরিবার। গ্রামটির নাম শিশুমারা। তার দক্ষিণে নামাজেরচর ও চর ইটালুকান্দা তারপর গেন্দার আলগা বাজার।
পুরো টিম তখন কাজে লেগে গেল। আমরা এলাকার মানুষের সাথে পিআরএ পদ্ধতিতে কাজ করছি। এসময় কাজের ফাঁকে পরিচয় হল বেশ কয়েকজন মানুষের সাথে। তাদের মধ্যে একজনকে দেখে প্রথমে চমকে উঠেছিলাম। তিনি ছিলেন ওই ইউনিয়নের দফাদার। নাম ছলিম মিয়া। প্রায় ছয় ফুটের মত লম্বা। পাকানো মোটা গোঁফ। টকটকে লাল চোখ। ঠিক যেন ডাকাতের মত চেহারা। আমাদেরকে।

লেখাটি কুড়িগ্রামের সিনিয়র সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর সূর্য’র ফেসবুক টাইমলাইন থেকে নেয়া।

এ বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © Rangpur Sangbad
Design & Develop By RSK HOST