1. rkarimlalmonirhat@gmail.com : Rezaul Karim Manik : Rezaul Karim Manik
  2. kibriyalalmonirhat84@gmail.com : Golam Kibriya : Golam Kibriya
  3. mukulrangpur16@gmail.com : Saiful Islam Mukul : Saiful Islam Mukul
  4. maniklalrangpur@gmail.com : রংপুর সংবাদ : রংপুর সংবাদ
কিশোর বয়সে ‘রক্তক্ষুধা’ - রংপুর সংবাদ
রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৪:০৯ পূর্বাহ্ন

কিশোর বয়সে ‘রক্তক্ষুধা’

রেজোয়ান বিশ্বাস
  • আপডেট সময় : শুক্রবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২১

১৫ কিশোর, একটি গ্রুপ। এলাকার মোড়ে মোড়ে নিয়ম মেনে আড্ডায় মাতে। তাদের সবারই মাদকের অন্ধকার গলি চেনা। ছোট-বড় কাউকেই করে না সমীহ। কিশোর বয়স, টগবগে রক্ত। তুচ্ছ কারণে প্রায়ই বিগড়ে যায় তাদের মেজাজ। লেগে পড়ে ঝগড়া-বিবাদে। এই নিয়ে এক কথায়-দুই কথায় জারি হয়ে যায় একে অন্যকে খুনের হুমকিও। এরপর হঠাৎ একদিন যার সঙ্গে এত দিনের উঠাবসা তাকেই সত্যি সত্যি হত্যা করে বসে। গত সোমবার রাতে পুরান ঢাকার কামরাঙ্গীর চর বড়গ্রাম মধ্য ইসলামনগর এলাকায় কিশোর সানোয়ার হোসেন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে এমনই তথ্যের খোঁজ পেয়েছে পুলিশ।

ওই এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের একাধিক গ্রুপ। তাদের বেশির ভাগই মাদক কারবারে সম্পৃক্ত। পারিবারিক অনুশাসন না থাকায় তারা নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। বখে যাওয়া এই কিশোরদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরাও বাগে আনতে পারছেন না। ফলে হত্যার মতো স্পর্শকাতর ঘটনায় জড়িয়ে নিজেদের হাত রক্তাক্ত করছে।

পুলিশ সূত্র বলছে, রাজধানীতে প্রতি মাসে হত্যার ঘটনা ঘটে গড়ে ২০টি। এর বেশির ভাগ ঘটনায় কিশোর অপরাধীরা জড়িত বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে। আবার ২০১৮ সাল থেকে গত জানুয়ারি পর্যন্ত রাজধানীতে হওয়া ৩৬৩টি ছিনতাইয়ের নেপথ্যেও ছিল কিশোররা। প্রায় একই ছবি ঢাকার বাইরেও। কিশোর গ্যাংয়ের বড় উদাহরণ হয়ে আছে বরগুনার নয়ন বন্ড। ডাকাতি, মাদক, চাঁদাবাজি, যৌন হয়রানি, শ্লীলতাহানিকাণ্ডেও জড়িত থাকছে এই কিশোররাই।

তবে এলাকাভিত্তিক খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা শতাধিক। এক এলাকায় রয়েছে একাধিক গ্যাং। এর মধ্যে মিরপুর ও উত্তরায় সবচেয়ে বেশি। গ্যাং সদস্যদের মধ্যে অনেকে নামিদামি স্কুলের শিক্ষার্থী এবং ধনী ও শিক্ষিত পরিবারের সন্তান রয়েছে। রাজধানীর কলাবাগানে ইংরেজি মাধ্যম পড়ুয়া ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলেদের নাম এসেছিল।

র‌্যাবের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে কিশোর গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রক বা পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকায় কিছু বড় ভাইও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এই কিশোর অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে পুলিশ সদর দপ্তর। এই ব্যাপারে নিয়মিত খোঁজ রাখছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) বলছে, কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তারা ২৩০ জনের একটি তালিকা করেছে। ওই তালিকা ধরে ওই কিশোরদের আইনের আওতায় আনতে বিশেষ পরিকল্পনা চলছে। শুধু বখাটে কিশোরদের নিয়ন্ত্রণই নয়, তাদের অভিভাবকদেরও জবাবদিহির মধ্যে আনার চেষ্টা চলছে। সেই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও থানা পুলিশের মাধ্যমে এলাকায় উঠান বৈঠক করে এই সামাজিক সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এ অবস্থায় পারিবারিক অনুশাসন, সংস্কৃতিচর্চা, খেলাধুলার সুযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। জানতে চাইলে অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. জিয়াউর রহমান বলেন, সামাজিক যে অনুশাসনগুলো ছিল এগুলো সমাজে কাজ করছে না। যেমন সমাজের ভেতর পরিবার, প্রতিবেশী, এলাকাভিত্তিক সংস্কৃতিচর্চা, বন্ডিং—এগুলো নষ্ট হয়ে ছন্দঃপতন ঘটছে। এ ছাড়া সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও খেলাধুলা একদমই নেই। এসব কারণে কিশোর-তরুণরা নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাই শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর মাধ্যমে কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এদের বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ার পাশাপাশি প্রতিটি পরিবারকে সচেতন হতে হবে।

সানোয়ার হত্যার তদন্ত চলছে : কিশোর সানোয়ার হত্যার ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে জানিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) জসিম উদ্দিন মোল্লাহ বলেন, ‘সানোয়ার হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এরই মধ্যে ছয় কিশোরকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।’ বেপরোয়া কিশোরদের নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এদের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। যখন যে ঘটনা ঘটছে, ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সানোয়ার কামরাঙ্গীর চর বড়গ্রাম মধ্য ইসলামনগর এলাকায় পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। বাবার সঙ্গে তিনি মিটফোর্ড এলাকায় মাস্ক বিক্রি করতেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারী কামরাঙ্গীর চর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোস্তফা আনোয়ার বলেন, ‘তারা সবাই একসঙ্গে চলাফেরা করত। সোমবার রাতে আচারওয়ালা ঘাট মধ্য মমিনবাগের মসজিদ গলিতে মাদক নিয়ে বিরোধের জেরে সানোয়ারের সঙ্গে হৃদয়ের ঝগড়া হয়। পরে রাতেই সানোয়ারকে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় সানোয়ারের বাবা ওমর চান সাতজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন।

আদেশ না মানায় গলা কেটে হত্যা : সানোয়ার হত্যার তিন দিন আগে গত শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে লালবাগের ৪৭/১ ডুরি আঙ্গুলি লেনের পাঁচতলা একটি ভবনের ছাদ থেকে হাফিজ নামের অন্য এক কিশোরের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করা হয়। তার লাশ উদ্ধারের সময় হাফিজের গলা, ঘাড় ও পেটে ধারালো অস্ত্রের আঘাত ছিল। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা লালবাগ থানার এসআই শেখ ফিরোজ আলম বলেন, ‘ওই কিশোরকে হত্যা করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে পাটের রশি ও রক্তমাখা বস্তা, চিপসের প্যাকেটসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে।’ এদিকে এর আগে গত ১২ জানুয়ারি দুপুরে রাজধানীর মুগদায় খুন হয় কিশোর মেহেদি হাসান। কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে এ হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে অন্তত ১৫ কিশোরের সম্পৃক্ততা মিলেছে।

টঙ্গীর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে বিবাদেও কিশোরে মৃত্যু : গত জুলাইতে গাজীপুরের টঙ্গীর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে দুই কিশোরের মধ্যে মারামারির ঘটনায় একজনের মৃত্যু হয়। গেল ছয় মাসের মধ্যে সেখানে দুই কিশোরের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। বর্তমানে সেখানে ধারণক্ষমতার প্রায় দুই গুণ বেশি বন্দি রয়েছে।  জানা যায়, কিশোররা প্রায়ই সেখানে নিজেদের মধ্যে মারামারি, ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়ে। নানা মানসিক চাপে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়া অনেক কিশোর আত্মহত্যা বা পালানোর চেষ্টা করে। এর আগে গত ৩ জুন রাতে আত্মহত্যার চেষ্টা করে এক কিশোর। এর আগে গেল বছরের সেপ্টেম্বরে চিকিৎসা নিতে এসে পালিয়ে যায় এক কিশোর। এক মাস পর তাকে উদ্ধার করে টঙ্গী পূর্ব থানার পুলিশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রটিতে মোট ৩০০ কিশোর বন্দির আবাসন সুবিধা রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে সেখানে সাত শতাধিক কিশোর বন্দি থাকছে। বিভিন্ন অপরাধে জড়ানো বা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে দেশের ৩৩ জেলা থেকে এখানে রাখা হয় কিশোরদের।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তারা যা বলছেন :  ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মহামারি করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও আমরা কিশোর গ্যাং নিয়ে বেশ চাপের মুখে আছি। কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণই এখন বড় চ্যালেঞ্জ মনে হচ্ছে।’ কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে র‌্যাবের প্রতিটি দল তৎপর রয়েছে বলে জানান র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন।

আপনার সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার দিন

এই ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ

© ২০২১ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | রংপুর সংবাদ.কম
Theme Customization By NewsSun
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com