রংপুর সংবাদ » সোনালী ধানের ঘ্রাণে আসছে নবান্ন

সোনালী ধানের ঘ্রাণে আসছে নবান্ন


রংপুর সংবাদ নভেম্বর ২২, ২০১৯, ৮:৪৬ অপরাহ্ন
সোনালী ধানের ঘ্রাণে আসছে নবান্ন

এই হেমন্তে কাটা হবে ধান। আবার শূন্য গোলায় জাগবে ফসলের বান…। বান এসেছে ফসলের। এখন গোলাভর্তি ধান। মরা কার্তিক শেষ। শুরু হয়েছে সমৃদ্ধির অগ্রহায়ণ। নতুন চালে হবে নবান্ন। ঘরে ঘরে চলবে পিঠাপুলির আয়োজন। কার্তিকের দিন শেষে, অবশেষে কিষাণীদের নতুন গানে, নতুন চালের ঘ্রাণে, আজকের এই অঘ্রানে, শামীমাদের ঘরে ঘরে হেমন্তের নবান্ন উৎসব। কাল শনিবার ১ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ। নতুন মাসের প্রথম দিন উদযাপিত হবে ঐতিহ্যবাহী নবান্ন উৎসব। ফসলকেন্দ্রিক সবচেয়ে প্রাচীন এবং প্রধান উৎসবে মাতবে গ্রামবাংলা।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে অনেক কিছু। বর্তমানে সারাবছরই কিছু না কিছু ফসল হয়। সনাতন মাড়াই প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে। যন্ত্রযুগে প্রবেশ করেছে গ্রাম। এখন শহুরে মানসিকতার কাছে মার খাচ্ছে গ্রামীণ মূল্যবোধ। আধুনিকতার ঠমক আর অন্যের চর্চায় অভ্যস্ত বাঙালি নিজের অনেক কিছুই খুইয়েছে। বর্তমানে আগের মতো বিপুল আয়োজনে হয় না নবান্ন উৎসব। তবে ¤øান হয়ে যায়নি আনন্দ। আজ এতিহ্যবাহী আচার উৎসবে মাতবে বাঙালী। প্রাকৃতজনের জীবন ও লোক চেতনায় উদ্ভাসিত হবে নগর।

নবান্ন মানে নতুন অন্ন। নতুন চালের রান্না উপলক্ষে আয়োজিত উৎসবটি নবান্ন নামে পরিচিতি পায়। সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান পাকার পর এ উৎসব শুরু হয়। ইতিহাস বলে, হাজার-হাজার বছর আগে কৃষিপ্রথা চালু হওয়ার পর থেকেই নবান্ন উৎসব পালন হয়ে আসছে। তখন থেকেই ঘরে ফসল তোলার আনন্দে নবান্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। কৃষিজীবী সমাজে শস্য উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে যে সকল আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব পালিত হয়, নবান্ন সেগুলোর অন্যতম।

প্রতিবারের মতো এবারও অগ্রহায়ণের শুরুতে সোনার ফসলে ভরে উঠেছে কৃষকের জমি। হেমন্তের মৃদুমন্দ বাতাসে খেলা করছে পাকা ধানের শীষ। আপন মনে হেলছে দুলছে। দেখে মন ভরে যায়। সোনালি ফসলের দিকে তাকিয়ে নতুন নতুন স্বপ্ন বুনছেন কৃষক। ধান কাটার কাজও শুরু হয়ে গেছে বিভিন্ন অঞ্চলে। লোককবির ভাষায়Ñ আইলো অঘ্রাণ খুশীতে নাচে প্রাণ। চাষি কাঁচিতে দিলো শান। কাঁচি হাতে কচ কচা কচ কাটে চাষি পাকা ধান…। নতুন এ ধান ঘরে তোলার পর আয়োজন করা হবে নবান্ন উৎসবের। বিভিন্ন অঞ্চলে ফসল কাটার আগে বিজোড় সংখ্যক ধানের ছড়া কেটে ঘরের চালে বেঁধে রাখা হয়। বাকি অংশ চাল করে সে চালে পায়েস রান্না করা হয়।

আজ নবান্ন উৎসবের দিনে বাংলার কৃষকের ঘরে হরেক পদের রান্না হবে। এক সময় কুড়ি থেকে চল্লিশ পদের তরকারি করা হতো, তার কিছু হলেও দেখা যাবে আজ। তালিকায় থাকবে সব ধরনের শাক। ভর্তা, ভাজি। আর পিঠাপুলি ও পায়েসের কথা তো বলাই বাহুল্য। আজ এর শ্রেষ্ঠ সময়। ঘরে ঘরে পিঠাপুলি, পায়েস হবে। ধুম পড়বে নেমন্তন্ন খাওয়া ও খাওয়ানোর।

সনাতন বিশ্বাস অনুযায়ী, নবান্ন উৎসবের সঙ্গে ধর্মীয় কিছু আনুষ্ঠানিকতাও যোগ করা হয়। হিন্দুরা নতুন ধান উৎপাদনের সময় পিতৃপুরুষ অন্ন প্রার্থনা করে থাকেন। পার্বণ বিধি অনুযায়ী হয় শ্রাদ্ধানুষ্ঠান। শাস্ত্রমতে, নবান্ন শ্রাদ্ধ না করে নতুন অন্ন গ্রহণ করলে পাপের ভাগী হতে হয়। কে চায় অমন পাপ করতে!

অমুসলিম রীতিতে, নবান্ন অনুষ্ঠানে নতুন অন্ন পিতৃপুরুষ, দেবতা, কাক ইত্যাদি প্রাণীকে উৎসর্গ করে। আত্মীয়স্বজনকে পরিবেশন করার পর গৃহকর্তা ও পরিবারবর্গ নতুন গুড়সহ নতুন অন্ন গ্রহণ করেন। নতুন চালের তৈরি খাদ্যসামগ্রী কাককে নিবেদন করা বিশেষ লৌকিক প্রথা। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, কাকের মাধ্যমে ওই খাদ্য মৃতের আত্মার কাছে পৌঁছে যায়। এ নৈবেদ্যকে বলে ‘কাকবলি’। অতীতে পৌষ সংক্রান্তির দিনও গৃহদেবতাকে নবান্ন নিবেদন করার প্রথা ছিল। কাকবলির আগে আরও তিনটি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার নিয়ম রয়েছে। সেগুলো হচ্ছেÑ ল²ীপূজা, পিতৃশ্রাদ্ধ ও বীরবাশ। বীরবাশের প্রথা মূলত বরিশাল অঞ্চলের। এর নিয়ম অনুযায়ী, বাড়ির উঠানের মাঝখানে একটি গর্ত করা হয়। তার চারপাশে পিটুলী দিয়ে আলপনা আঁকা হয়। এর পর গর্তে জ্যান্ত কই মাছ ও দুধ দিয়ে একটি বাঁশ পোঁতা হয়। ওই বাঁশের প্রতি কঞ্চিতে বাঁধা হয় ধানের ছড়া। নবান্ন উৎসবে কাকবলি, ল²ীপূজা, পিতৃশ্রাদ্ধ হয়ে গেলে সবাই একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করেন। এর আগে কেউ কিছু মুখে নেন না। বহু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া গ্রামে এখনও নবান্ন উৎসবের আয়োজন করা হয়। এবারও মহাআনন্দে উৎসব উদযাপন করবে বাংলার কৃষক। নতুন চালে পিঠাপুলির আয়োজন করা হবে। আছে আরও অনেক প্রাচীন রীতি। সেগুলো মেনেই হবে নবান্ন উৎসব। এখন বাংলার ঘরে ঘরে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।