1. rkarimlalmonirhat@gmail.com : Rezaul Karim Manik : Rezaul Karim Manik
  2. kibriyalalmonirhat84@gmail.com : Golam Kibriya : Golam Kibriya
  3. mukulrangpur16@gmail.com : Saiful Islam Mukul : Saiful Islam Mukul
  4. maniklalrangpur@gmail.com : রংপুর সংবাদ : রংপুর সংবাদ
সাকিবের মিথ্যাচার এবং ক্রিকেটে উৎকট বাণিজ্য | রংপুর সংবাদ
শনিবার, ১৯ জুন ২০২১, ০৭:২৬ অপরাহ্ন

সাকিবের মিথ্যাচার এবং ক্রিকেটে উৎকট বাণিজ্য

ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় : শনিবার, ৮ মে, ২০২১

সাকিব আল হাসান যেমন প্রতিভার বরপুত্র, তেমনি বিতর্কেরও। মাঠের বাইরের অনেক বিতর্ক চাপা দিয়ে দেন তিনি একটা দুর্দান্ত ডেলিভারিতে বা একটা সেঞ্চুরিতে। গত বিশ্বকাপের আগে মিরপুর মাঠে এসেও টিম ফটোসেশনে অংশ না নিয়ে চলে গিয়েছিলেন সাকিব। বড় টুর্নামেন্টের আগে টিম ফটোসেশন ক্রিকেট ঐতিহ্যেরই অংশ। সেই ঐতিহ্যকে পাত্তাই দেননি সাকিব। এ নিয়ে সমালোচকদের মুখ বন্ধ করে দিয়েছেন বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে। কথায় বলে না যে গরু দুধ দেয়, তার লাথিও ভালো। সাকিব তেমনি দুধেল গাই। তিনি বিতর্ক দিয়ে যেন নিজেকে চাঙা করেন। পারফরম্যান্স দিয়ে সব ভুলিয়ে দেন। বিতর্ক যেন তার অনুপ্রেরণা।

এক বছর নিষিদ্ধ থাকার পর ফিরে এসেই একের পর এক বিতর্কে জড়াচ্ছেন তিনি। কেন যেন মনে হয়, সাকিব ইচ্ছা করে বিতর্কে জড়ান। বিতর্ক না হলে ভালো করার তাগিদ পান না হয়তো। সাকিবের অনেক সমালোচনার একটি হলো, তিনি উদ্ধত, বেয়াদব, কাউকে পাত্তা দেন না, বিতর্ককে গায়ে মাখেন না। হাঁসের মতো গা ঝাড়া দিয়ে মুছে ফেলেন সব ময়লা। কিন্তু এবার সাকিবকে একটু অচেনা লাগলো। বিতর্ক সৃষ্টিতে চেনা মনে হলেও পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় ভীষণ অচেনা। সাকিব কি ভয় পেয়েছেন নাকি তিনি উপলব্ধি করেছেন?

কলকাতার একটি কালীপূজা উদ্বোধন বা অংশগ্রহণ নিয়ে যে বিতর্ক, তার ঢেউ এখন বাংলাদেশ ছাড়িয়ে ভারতে। শুধু কলকাতা নয়, এমনকি সে ঢেউ বলিউড পর্যন্ত ছড়িয়েছে। প্রথম বিতর্ক কালীপূজা উদ্বোধন বা অংশগ্রহণ নিয়ে। এরপর বাংলাদেশে মৌলবাদীদের আস্ফালন, সিলেটে এক মৌলবাদীর হত্যার হুমকি। তাতেই ভয় পেয়ে সাকিব মুসলমানদের কাছে ক্ষমা চাইলেন। সাকিব ক্ষমা চাওয়ার পর বিতর্কের ঢেউ আরো তীব্র হয়েছে এবং তা সীমানা ছাড়িয়েছে।

সাকিবের পূজায় অংশ নেয়া, ক্ষমা চাওয়া নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। সে প্রসঙ্গে নাই গেলাম। আমাকে সবচেয়ে বেশি হতাশ করেছে, সাকিবের আত্মসমর্পণ এবং সাকিবের মিথ্যাচার। সাকিব দাবি করেছেন, তিনি কালীপূজা উদ্বোধন করেননি এবং একজন গর্বিত মুসলমান হিসেবে কখনো করবেনও না। খুব ভালো কথা। কিন্তু তাহলে সাকিব হঠাৎ এই করোনাকালীন সময়ে সড়কপথে একদিনের জন্য কলকাতা ছুটে গেলেন কেন?

সাকিব তার ক্ষমা চাওয়ার ভিডিওতে যাই বলুন, এটা এখন পরিষ্কার তিনি ‘আমরা সবাই’ ক্লাব আয়োজিত শ্যামা পূজার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নিতেই কলকাতা গিয়েছিলেন। তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন বিধায়ক পরেশ পাল। এই পরেশদার কথা সাকিব তার ভিডিওতেও বলেছেন। সাকিবের কাছে পরেশ পালের পাঠানো আমন্ত্রণপত্র এবং কলকাতায় ‘আমরা সবাই’ ক্লাবের বিলি করা আমন্ত্রণপত্রের ছবি এখন পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে। তাতে স্পষ্ট করে লেখা আছে, সাকিব পরেশ পালের আমন্ত্রণেই কলকাতা গেছেন এবং তিনি ছিলেন ‘আমরা সবাই’ ক্লাব আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী শ্যামা পূজার ৫৯তম আয়োজনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি।

গত ১ নভেম্বর পরেশ পাল সাকিবের কাছে যে চিঠি পাঠিয়েছেন, তাতেও তাকে ১২ নভেম্বর দিওয়ালির ওপেনিং সিরিমনির স্পেশাল গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। সেই চিঠিতে সাকিবকে পূজার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ফিতা কাটার কথাও বলা হয়েছিল। তার মানে কলকাতা গিয়ে কী কী করতে হবে, তা জেনেশুনেই সাকিব সেখানে গেছেন। ‘আমরা সবাই’ ক্লাবের আমন্ত্রণপত্রে লেখা ছিল, “মহাশয়, প্রত্যেক বছরের ন্যায় এ বছরও আগামী ১২ই নভেম্বর ২০২০, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় “আমরা সবাই” পরিচালিত ৫৯তম বর্ষে কাঁকুড়গাছি সম্মিলিত সার্বজনীন শ্রীশ্রী শ্যামাপূজার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত থাকবেন মাননীয় মহানাগরিক ও রাজ্যের মন্ত্রী জনাব ফিরহাদ হাকিম, এছাড়া উপস্থিত থাকবেন বাংলাদেশের স্বনামধন্য ক্রিকেটার জনাব সাকিবুল হাসান। উক্ত অনুষ্ঠানে আপনি সম্মানীয় অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকিলে আন্তরিকভাবে খুশি হব- বিনীত পরেশ পাল, বিধায়ক।”

কলকাতার লোকজন বাংলাদেশের মানুষের নাম নিয়ে যে বিকৃতিটা করে, এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সাকিব আল হাসানকে তারা লিখেছে ‘সাকিবুল হাসান’। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পরেশ পালের আমন্ত্রণেই কালী পূজার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি হতে বিশেষ ভিসা নিয়ে মাত্র একদিনের জন্য সড়কপথে কলকাতা গিয়েছিলেন। কালী পূজা উপলক্ষে যে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, সাকিবের ভাষ্য অনুযায়ী তিনি সেখানে ৪০-৪৫ মিনিট ছিলেন। সে মঞ্চে সাকিবই একমাত্র ‘গর্বিত মুসলমান’ ছিলেন না। মঞ্চে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কলকাতা পৌরসভার মেয়র ও মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন কলকাতায় বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশনার তৌফিক হাসান, বাংলাদেশ উপ-দূতাবাসের কাউন্সিলর বি এম জামাল হোসেন এবং উপ-দূতাবাসের প্রথম সচিব মোফাককারুল ইকবাল। সেখানে বক্তারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে জোরালো বক্তব্য রেখেছেন।

মঞ্চের আনুষ্ঠানিকতা শেষে সাকিব আল হাসানকে ঘোড়ার গাড়িতে চড়িয়ে পূজামণ্ডপে নেয়া হয়। সেখানে তিনি ফিতা কাটেন, প্রদীপ জ্বালান এবং ছবি তোলেন। অথচ সাকিব আল হাসান তার ক্ষমা ভিডিওতে এমনভাবে বলেছেন যেন তিনি অন্য একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। সেখানে হঠাৎ পূর্বপরিচিত পরেশ পালের সাথে তার দেখা হয়ে যায়। মঞ্চ থেকে নেমে গাড়িতে উঠতে যাওয়ার সময় তার অনুরোধে ২-৩ মিনিটের জন্য পূজামণ্ডপে গেছেন। অথচ তিনি পূজার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্পেশাল গেস্ট অব অনার থাকবেন, ফিতা কাটবেন, প্রদীপ জ্বালাবেন- এসবই পূর্বনির্ধারিত। সাকিব এখন চাপের মুখে মিথ্যাচার করছেন। মৌলবাদীদের দাবির মুখে ক্ষমা চেয়ে সাকিব ধর্মনিরপেক্ষতার লড়াই আরো জটিল করে দিয়েছেন। তবে সাকিব আল হাসানের এমন মিথ্যাচার বড্ড কানে লেগেছে। সাকিব তার ক্ষমার ভিডিওতে যে অনুষ্ঠানের কথা বারবার বলছিলেন, যে মঞ্চে তিনি ৪০-৪৫ মিনিট ছিলেন, সেটি কীসের অনুষ্ঠান; তা একবারও পরিষ্কার করেননি। বাস্তবতা হলো যে কোনো বড় পূজার আয়োজনে আনুষ্ঠানিকতা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের একটি মঞ্চ থাকে পূজামণ্ডপের পাশে। সেটি পূজার উৎসবের অংশ। সাকিব সেই মঞ্চেই ছিলেন। সৎ সাহস থাকলে সাকিব স্পষ্ট করে বলতে পারতেন, ‘আমি পয়সার বিনিময়ে বিশেষ অতিথি হিসেবে কালীপূজার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের অংশ নিয়েছি।‘ আমাদের দেশের সেরা তারকার এটুকু সততা নেই, এটা দুঃখজনক।

এখন কথা হলো কালীপূজাই হোক আর এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ যে অনুষ্ঠানই হোক, সাকিব এমন উতলা হয়ে একদিনের জন্য সড়কপথে কলকাতা গেলেন কেন? এ প্রশ্নের একটাই উত্তর- টাকা। সঠিক অঙ্কটা উল্লেখ করা না থাকলেও বাংলাদেশ ও ভারতের অনেকগুলো পত্রিকায় লেখা হয়েছে, মোটা অঙ্কের অ্যাপিয়ারেন্স মানির বিনিময়েই সাকিব কলকাতায় পূজার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছেন। নইলে যিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন সেই পরেশ পাল বা কালীপূজার যে অনুষ্ঠান তার সাথে ক্রিকেটের কোনো সম্পর্ক নেই। যদি সৌরভ গাঙ্গুলি আমন্ত্রণ জানাতেন, তাহলেও না হয় কথা ছিল। তার মানে শুধু টাকাই সাকিব আল হাসানকে কলকাতা টেনে নিয়েছে। টাকা পেয়ে তিনি দেখেনওনি কোন অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন। এখন চাপের মুখে সত্য-মিথ্যায় লেজেগোবরে অবস্থা।

টাকার জন্য যে শুধু কলকাতায় ছুটে গেছেন তাই নয়; যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফেরার মাত্র ১০ ঘণ্টার মধ্যে স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করে গুলশানে একটি সুপারশপ উদ্বোধন করতে যান সাকিব। লম্বা পথ উড়ে আসলে জেটল্যাগ কাটতে ২-৩ দিন লেগে যায়। সাকিব নিয়মিত ফ্লাই করেন। তাই জেটল্যাগ হয়তো তাকে কাবু করতে পারে না। কিন্তু তাই বলে এই করোনাকালে মাত্র ১০ ঘণ্টার মধ্যে সুপারশপ উদ্বোধন করতেও সাকিবকেই যেতে হবে! আপনারাই বলুন, সাকিব কেন সুপারশপ উদ্বোধন করতে গিয়েছিলেন? এ প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয়ই আপনারা সবাই জানেন- টাকা। এই টাকাই সাকিবকে সুপারশপে, পূজামণ্ডপে টেনে নিয়ে যায়। সাকিবের আসলে কত টাকা লাগে?

সাকিবের কত টাকা লাগবে, সেই লিমিট সাকিবই ঠিক করবেন। সেটা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। কারো ১০ টাকায় হয়, কারো ১০ কোটিতেও চলে না। আর সাকিব অবৈধভাবেও টাকা উপার্জন করছেন না। তাই সাকিবের টাকার চাহিদা নিয়ে আমার কোনো প্রশ্ন নেই। তবে সাকিব আমার দেশের এক নাম্বার তারকা তাকে টাকার জন্য সুপারশপ উদ্বোধন করতে বা ১২ ঘণ্টা জার্নি করে একটি পাড়ার পূজা উদ্বোধন করতে কলকাতা যেতে দেখলে খারাপ লাগে। টাকার চাহিদা সবারই আছে। আর খেলোয়াড়রা জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে মডেল হন, এনডোর্সমেন্ট মানি বা অ্যাপিয়ারেন্স মানি পান। সবই ঠিক আছে। কিন্তু মাত্রাটা জানা থাকা জরুরি।

একসময় বাংলাদেশে জনপ্রিয় খেলা ছিল ফুটবল। এখন যেমন ফুটবল, সত্তর ও আশির দশকের ক্রিকেট ছিল তেমনি দুয়োরানী। তখন আমাদের পূর্বসূরিরা খেয়ে না খেয়ে ক্রিকেটকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। সেই ক্রিকেটেই আজ টাকার ঝনঝনানি। টাকার জৌলুস, ক্রিকেটের মাহাত্ম্য অনেকটাই ঢেকে দিয়েছে। ক্রিকেট এখন আর নিছক ভদ্রলোকের খেলা নয়। এ পাড়ায় এখন জুয়াড়িদের আনাগোনা। বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রতিভাবান ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ আশরাফুলের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দিয়েছে লোভ। সেই লোভের ফাঁদে পড়ে সাকিবও এক বছরের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে এসেছেন। আইসিসি কিন্তু ডাঙ্গুলি খেলার জন্য সাকিবকে এক বছর নিষিদ্ধ করেনি। আইসিসির নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেও সাকিব কিন্তু নৈতিকতার প্রশ্নে অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশে খেলতে পারবেন না।

আমি আশা করেছিলাম এক বছরের এই নিষেধাজ্ঞা শেষে সাকিব ফিরবেন শুদ্ধ হয়ে। কিন্তু ফিরেই সাকিব লোভের যে উৎকট প্রকাশ দেখালেন, তা বড্ড বেমানান। টাকা ছাড়া ক্রিকেটারদের চলবে না। তবে টাকা যেন ক্রিকেটকে ছাড়িয়ে না যায়। কালো বাণিজ্য যেন ঢেকে না দেয় ক্রিকেটের শুভ্রতাকে।

প্রভাষ আমিন, হেড অব নিউজ, এটিএননিউজ

আপনার সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার দিন

এই ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ

© ২০২১ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | রংপুর সংবাদ.কম
Theme Customization By NewsSun